Showing posts with label বাগান করা. Show all posts
Showing posts with label বাগান করা. Show all posts

Sunday, January 26, 2025

পথতরু শহরে পরিকল্পিতভাবে লাগাতে হবে

পথতরু শহরে পরিকল্পিতভাবে লাগাতে হবে



পথতরু শহরে ছায়ার জন্য, সৌন্দর্যের জন্য লাগান হয়। পথতরু হিসেবে আমরা ফুলের গছের দিকে আকৃষ্ট হই। বেশি পাতা আছে, অক্সিজেন দেয়, কার্বডাই অক্সাইড শোষন করে এমন গাছই লাগানো হয়। 

শহরে ফলের গাছ লাগানো উচিত একটু চিন্তা করে। কিন্তু আমাদের নজর থাকে ফুলের দিকে। যাতে শহরে নানা রকম ফুল ফোটে। কিন্তু আমাদের শহরে যে অবস্থা। এতসব বাড়িঘর! তার মধ্যে গাছ খুবই কম। 

মহাসড়কে এমন গাছ লাগাতে হবে যেটা পাশে ছড়াবেনা, সোজা হয়ে থাকবে। অক্সিজেন দিবে, কার্বনডাই অক্সাইড শোষণ করবে। বাতাস ঠান্ডা রাখবে। এখানে ভেষজ গাছ লাগানো যেতে পারে।


হাইওয়ে বা মহাসড়ক যাদের মাঝখানে অনেক জায়গা  আছে। এখানে আজেবাজে যত গাছ, ছোট গাছ, মেজো গাছ দুনিয়ার জঞ্জাল করে রেখেছে। এটা একটা স্পেস, এটা সাজানোর জন্য পরিকল্পনা থাকা উচিত। মহাসড়কের ওপর রোদ থাকতে হবে, এখানে ছায়া থাকবেনা। মহাসড়কে এমন গাছ লাগতে হবে যাতে ছায়া না দেয়। বড় বড় রেইনটি লাগালে বড় হলে ডালা ভেঙ্গে পরলে অনেক সমস্যা।


জাতীয় সংসদ ভবনের পাশে খেজুর বাগান নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলে। এগুলা আসলে আমাদের দেশের খেজুর। এটা আমাদের গাছ। এটা আরবের গাছ না। আরবের খেজুর আমাদের দেশে ফল ধরেনা। আমরা খেজুরকে ভাবি মরুভূমির গাছ। এটা ঠিকনা। তাল, খেজুর, নারকেল এগুলোসব আমাদের গাছ। এগুলো অবস্থা বিবেচনা করে যেখানে খুশি সেখানে লাগান যায়।
 
বজ্রপাত হয়ে মানুষের  মারা বন্ধ করার জন্য তাল গাছ লাগানো হচ্ছে। তাল গাছ উপরে থাকে, উপরেই বিদুৎ ধরে ফেলে। সে বিদ্যুৎ গাছের ভিতর দিয়ে মাটিতে চলে যায়। বজ্রপাতের বিদ্যুৎ পৃথিবীতে নামার জন্য কন্ডাকটার খোজে। মানুষ ভাল কনন্ডাকটার। মানুষের ভিতর নামতে গিয়ে মানুষের জীবন শেষ করে। 

আমাদের শহরে গাছ লাগাতে কোন পরিকল্পনা নাই। এ ক্ষেত্রে যার যা ইচ্ছা তা করছে। মিড আইল্যান্ড বা রাস্তার মাঝখানে গাছ লাগানোর কথা না। রাস্তার মাঝখানে নানা রকম ভৌত কাঠামো দিয়ে সাজাতে পারে। অথবা শুধু ঘাস থাকতে পারে, ছোট ছোট গাছ থাকতে পারে। রাস্তার দুই পাশে থাকে বড় গাছ। যাতে রাস্তায় ছায়া হয়। আমাদের শহরে দুই পাশ বন্ধ, গাছ লাগানোর কোন জায়গা রাখেনা। গাছ লাগানোর কোন স্কোপও রাখেনা। এইটাতো বিরাট সমস্যা। 

কোন কোনা জায়গায় রাস্তার দুই পাশে কিছু গাছ আছে। কিন্তু ঐগাছ বড় হবেনা। কারন গাছগুলোর শিকড় নিচে যেতে পারবেনা। সিমেন্ট দিয়ে সব আটকান। খাদ্য সংগ্রহ করতে পারবেনা। রাস্তার পাশের গাছ নিয়ে বিপদ অনেক। এই গাছগুলো দেখার কেউ নেই। যার কারনে গাছ ভেঙ্গে পড়ে মানুষকে প্রাণ দিতে হচ্ছে। 

বিদেশে প্রত্যেক এরিয়ার জন্য একজন গাছের ডাক্তার থাকে। তার কাজ হচ্ছে ঘুরে ঘুরে প্রত্যেকটা গাছ গিয়ে দেখবে। গাছে খোড়ল হচ্ছে কিনা,  সেটা সিমেন্ট দিয়ে বন্ধ করতে হয়। ক্ষত হচ্ছে কিনা, ক্ষত হলে চিকিৎসা করতে হয় এন্টিবায়োটিক দিয়ে। গাছের কোন ডাল কাটতে হলে তা কেটে সেপ সুন্দর করা ইত্যাদি করে থাকেন।। আমাদের এ বিদ্যাটাও নাই, চর্চাও নাই, ভাবনাও নাই। ফলে গাছে বড় বড় গর্ত হচ্ছে, রাস্তার পাশের গাছ উপরে পড়ছে। 


Saturday, January 25, 2025

ল্যান্ডস্কেপিং ও আপনার নিজের বাড়ির সম্মুখভাগ

ল্যান্ডস্কেপিং ও আপনার নিজের বাড়ির সম্মুখভাগ



ল্যান্ডস্কেপিং বলতে বোঝায় যে কোনও কার্যকলাপ যা ভূমির একটি এলাকার দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্যগুলিকে পরিবর্তন করে, যার মধ্যে নিম্নলিখিতগুলি রয়েছে:

 

জীবন্ত উপাদান, যেমন উদ্ভিদ বা প্রাণী; বা যাকে সাধারণত বাগান বলা হয়, ল্যান্ডস্কেপের মধ্যে একটি সৌন্দর্য তৈরি করার লক্ষ্যে ক্রমবর্ধমান উদ্ভিদের শিল্প ও নৈপুণ্য।

প্রাকৃতিক অ্যাবায়োটিক উপাদান, যেমন ভূমিরূপ, ভূখণ্ডের আকৃতি এবং উচ্চতা, বা জলের দেহ।

বিমূর্ত উপাদান, যেমন আবহাওয়া এবং আলোর অবস্থা।

ল্যান্ডস্কেপিংয়ের জন্য উদ্যানপালন এবং শৈল্পিক নকশা সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট বোঝার প্রয়োজন, তবে এটি গাছপালা এবং উদ্যানপালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যবহারযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য ভূমি ভাস্কর্য করা (পেটিও, ওয়াকওয়ে, পুকুর, জলের বৈশিষ্ট্য) এছাড়াও ল্যান্ডস্কেপিংয়ের উদাহরণ ব্যবহার করা হচ্ছে। যখন খাঁটিভাবে একটি নান্দনিক পরিবর্তন হিসাবে অভিপ্রেত, অর্নামেন্টাল ল্যান্ডস্কেপিং শব্দটি ব্যবহার করা হয়।

 

প্রায়শই, ডিজাইনাররা ল্যান্ডস্কেপিংকে আপনার বাড়ির কক্ষের সম্প্রসারণ হিসাবে উল্লেখ করে (প্রত্যেকটির একটি ফাংশন রয়েছে)। বহিরঙ্গন স্থানগুলিতে উপকরণ এবং কার্যকারিতা পর্যন্ত প্রচুর পরিমাণে নমনীয়তা রয়েছে। এটা প্রায়ই বলা হয় বাইরের স্থানের একমাত্র সীমাবদ্ধতা হল একজনের কল্পনা।

 

ল্যান্ডস্কেপ এমন একটি শিল্পকর্ম, যা একটি স্থাপনার সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে। প্রাকৃতিক ভাবে ভবনের বা স্থাপনার বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তুলে। বিজ্ঞানের বিভিন্ন কৌশলকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশ বান্ধব একটি সৃষ্টিশীল ল্যান্ডস্কেপ এ বাস্তবায়ন করা হয়ে থাকে। স্থাপনার পরিত্যক্ত ভুমিকে পরিপাটি ও দৃষ্টিনন্দন করে তুললে একদিকে যেমন, মানসিক অবস্থান পরিবর্তন আনে, ঠিক তেমনি অবসর সময় কাটাতে অবদান রাখে।

 

ল্যান্ডস্কেপিংয়ের জন্য উদ্যানপালন এবং শৈল্পিক নকশা সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট বোঝার প্রয়োজন, কিন্তু এটি গাছপালা এবং উদ্যানপালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যবহারযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য ভূমি ভাস্কর্য করা (ওয়াকওয়ে, পুকুর, জলের বৈশিষ্ট্য) এছাড়াও ল্যান্ডস্কেপিংয়ের উদাহরণ ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশুদ্ধরূপে একটি নান্দনিক পরিবর্তন হিসেবে অভিপ্রেত হলে, অর্নামেন্টাল ল্যান্ডস্কেপিং শব্দটি ব্যবহার করা হয়।

 

আপনার স্থাপনাকে প্রাকৃতিক, দৃষ্টিনন্দন ও পরিবেশ বান্ধব একটি সৃষ্টিশীল ল্যান্ডস্কেপ এ পরিনত করতে পারেন। Masterplan সাজিয়ে কোথায় কি হবে, সেটা ডিটেইল ওয়ার্কিং Drwaing এর মাধ্যমে একজন স্থপতি বিস্তারিত Detailing বুঝাবেন। আপনার পছন্দ ও সাধ্যের মধ্যে আকর্ষণীয় ল্যান্ডস্কেপিং ডিজাইন পেতে এক্সপার্ট টিম এর সাথে কনসালটেশন করুন।

Wednesday, September 18, 2019

পাঁচটি গাছকে 'না' বলুন

পাঁচটি গাছকে 'না' বলুন



ইউক্যালিপটাস। কারণ অতিমাত্রায় পানি শোষণকারী, নিম্নমানের কাঠ, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।

রেইন-ট্রি। কারণ এই আগ্রাসী গাছ অন্য গাছকে বাড়তে দেয় না, ঝরা পাতা ফসল ও মাছের জন্য ক্ষতিকর, কাঠও নিম্নমানের।

মেহগনি। এর ফল বিষাক্ত। পুকুরের পানিতে পড়লে মাছ মরে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। অত্যধিক রোপিত হওয়ায় পরিবেশের ভারসাম্য হুমকির মুখে। এর কাঠ ছাড়া অন্য কোনো ব্যবহার নেই।

 শিশু। কারণ এর কাঠ মাঝারি মানের, প্রকৃতি ও মানুষের সঙ্গে অন্য কোনো সম্পর্ক নেই।

একাশিয়া। কারণ এর মাইক্রোস্কোপিক রেণু অ্যালার্জি/অ্যাজমার অনুঘটক, কাঠ মাঝারি মানের, গঠন আঁকাবাঁকা, বাংলাদেশে অতিরিক্ত রোপিত।

Sunday, September 15, 2019

বাংলাদেশের গৃহস্থালিভিত্তিক গাছগাছড়া বা বনরাজি

বাংলাদেশের গৃহস্থালিভিত্তিক গাছগাছড়া বা বনরাজি



বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের গৃহস্থালিভিত্তিক গাছগাছড়া বা বনরাজির একটি জরিপ সম্পাদন করেছে। জরিপটি সম্পাদিত হয়েছিল ২০১১-১২ সালে। এ জরিপ দৈবচয়নের ভিত্তিতে ৬৩০০ গৃহস্থালির ওপর সম্পাদিত হয়েছে। জরিপের চয়ন অনুযায়ী এ সব গৃহস্থালি দেশের ১৮৪টি মৌজায় এবং ২টি মহল্লায় দেশের ৭টি বিভাগে ছড়ানো ছিল। জরিপের পদ্ধতি বিশ্লেষণ করলে এটা সুস্পষ্ট হয় যে, জরিপপ্রাপ্ত উপাত্তসমূহ (পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়া) সারাদেশের এ বিষয়াধীন অবস্থার প্রতিফলক এবং যুক্তিসঙ্গতভাবে ধরে নেয়া যায় এ জরিপে প্রাপ্ত উপাত্তসমূহ ২০১৫ সালের প্রথম দিকেও মোটা দাগে প্রযোজ্য।

এ জরিপে দেখা গেছে যে, দেশে গৃহস্থালি পর্যায়ে গাছগাছড়া বাবদ মূল্য সংযোজনের পরিমাণ (সমকালীন মূল্যে) ১২৩৮৯ কোটি টাকা। ২০১০-১১ সালে এর পরিমাণ ছিল ১০৮৮১ কোটি টাকা বা শতকরা প্রায় ১৪ ভাগ কম। ২০১০-১১-এর তুলনায় ২০১১-১২ সালে মূল্য সংযোজনের প্রকৃত বৃদ্ধির পরিমাণ এর চাইতে কম হবে বলে মনে হয়। টাকার নামিত মূল্যে ২০১১-১২ সালে প্রতিফলিত এ বৃদ্ধি সম্ভবত প্রকৃত বৃদ্ধির পরিমাপক নয়।

জরিপে দেখা গেছে, দেশের সকল গৃহস্থালিতে ২০১১-১২ সালে ৪০ কোটি ৩০ লাখ ফলদ গাছ, প্রায় ৪০ কোটি কাঠ গাছ, প্রায় ৫২ কোটি বাঁশ এবং প্রায় ১৩ কোটি অন্যান্য গাছগাছড়া ছিল। ২০১০-১১ সালের তুলনায় এক বছরে এই বৃদ্ধি ফলদ গাছের ক্ষেত্রে হয়েছে প্রায় শতকরা ৬ ভাগ, কাঠ-গাছের ক্ষেত্রে শতকরা ৪ ভাগ, বাঁশের ক্ষেত্রে প্রায় শতকরা ৭ ভাগ ও অন্যান্য গাছের ক্ষেত্রে প্রায় শতকরা ৫২ ভাগ। এতে প্রতীয়মান হয় যে, দেশের গৃহস্থালি পর্যায়ে গাছের সংখ্যা এক বছরে তাৎপর্যমূলকভাবে বেড়েছে এবং জনগণ অধিকতর সংখ্যায় গাছ রোপণ ও অধিকতর মাত্রায় গাছের যতœ করছেন।

জরিপে দেখা গেছে যে, ২০১১-১২ সালে প্রতি গৃহস্থালিতে গড়ে ৪৩টি বড় গাছ বিদ্যমান ছিল। ২০১০-১১ সালে প্রতি গৃহস্থালিতে এ গাছের গড় সংখ্যা ছিল ৪১।

পরিকল্পিতভাবে গৃহস্থালিতে সৃষ্ট বনের মধ্যে ২০১১-১২ সালে গাছের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৬ কোটি ৫০ লাখ। ২০১০-১১ সালে ওই সংখ্যা ছিল ৫১ কোটি ৮০ লাখ অর্থাৎ গৃহস্থালিতে পরিকল্পিতভাবে সৃৃজিত গাছগাছালির সংখ্যা বেড়েছে এক বছরে প্রায় শতকরা ২০ ভাগ। এ তথ্য প্রমাণ করে যে দেশের বিদ্যমান পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশে পরিকল্পিতভাবে গৃহস্থালি পর্যায়ে অধিকতর গাছগাছালি রোপণ ও লালন করা সম্ভব।

২০১১-১২ সালে গড়ে প্রতি গৃহস্থালিতে ৩.৭ শতাংশ ভূমি বা জমির ওপর পরিকল্পিতভাবে গাছগাছড়া রোপিত ও বিদ্যমান ছিল। ২০১০-১১ সালে সকল গৃহস্থালির জন্য এই গড় ছিল ৩.৫ শতাংশ। এ ক্ষেত্রেও দেখা যায় যে জনগণ প্রান্তিকভাবে অধিকতর জমি পরিকল্পিত বনায়নে প্রযুক্ত করেছেন।

২০১১-১২ সালে সারাদেশে ৩ কোটি ৫৮ লাখ ঘনফুট কাঠ গৃহস্থালিতে ব্যবহারের জন্য উৎপন্ন হয়েছে। এক বছর আগে এর পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৭৭ লাখ অর্থাৎ এক বছরে গৃহস্থালিতে ব্যবহৃত কাঠের পরিমাণ বেড়েছে শতকরা ২৯ ভাগেরও বেশি। ২০১১-১২ সালে গৃহস্থালি পর্যায়ে উৎপাদিত জ্বালানি কাঠের পরিমাণ হয়েছিল ৫১৯১৮৩৫ টন, যার মূল্য প্রাক্কলিত হয়েছে ৪৬৫১ কোটি টাকা। 

২০১০-১১ সালে গৃহস্থালি পর্যায়ে জ্বালানি কাঠের উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৪২৯০৬৫৪ টন অর্থাৎ শতকরা প্রায় ১৭ ভাগ কম। মূল্যের নিরিখে এ কমতির পরিমাণ ছিল শতকরা প্রায় ১৯ ভাগ কম। ২০১১-১২ সালে গৃহস্থালি প্রতি গড় উৎপাদিত জ্বালানি কাঠের পরিমাণ ছিল ১০৩৯ কেজি, যা ২০১০-১১ সালে ছিল ১০৬৮ কেজি। এর অর্থ প্রান্তিকভাবে জ্বালানি কাঠের উৎপাদন বাড়লেও গৃহস্থালি পর্যায়ে গড়ে গৃহস্থালির জন্য জ্বালানি কাঠের ব্যবহার কমে আসছে। টাকার মূল্যে গৃহস্থালি পর্যায়ে জ্বালানি কাঠের দাম প্রাক্কলিত হয়েছে ১০১৫৮ কেটি টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ৭৬৪ কোটি টাকা।

২০১১-১২ সালে বিক্রির জন্য গৃহস্থালি পর্যায়ে উৎপাদিত কাঠের পরিমাণ হয়েছিল প্রায় ১৩.১৬ কোটি ঘনফুট। ২০১০-১১ সালে এর পরিমাণ ছিল ১৩.২৪ কোটি ঘনফুট। এর অর্থ গৃহস্থালিতে উৎপাদিত গাছগাছড়ার ক্রমাগত বেশি অংশ গৃহস্থালিতেই ব্যবহৃত হচ্ছে, বাজারে যাচ্ছে না। ২০১১-১২ সালে অবশ্য গৃহস্থালিতে উৎপাদিত সকল গাছগাছড়ার মূল্য প্রাক্কলিত হয়েছে ৫০২৪৯ কোটি টাকা বা ২০১০-১১ সালের উৎপাদনের তুলনায় শতকরা ৩.২ ভাগেরও কম।

মূল্যস্ফীতি হিসেবে নিলে এই কমতির পরিমাণ আরও বেশি হয়। সার্বিকভাবে গৃহস্থালিতে ২০১১-১২ সালে উৎপাদিত কাঠের পরিমাণ ছিল ১৬.৭৪ কোটি ঘনফুট। এর মূল্য প্রাক্কলিত হয়েছে ৬০৪০৭ কোটি টাকা। এই উৎপাদন ও তার মূল্য ২০১০-১১ সালের তুলনায় প্রান্তিকভাবে বেশি।

২০১১-১২ সালে গৃহস্থালিতে উৎপাদিত রাবার লেটেক্সের পরিমাণ ছিল ১৫৫২ মেট্রিক টন। ২০১০-১১ সালে এর পরিমাণ ছিল ১০৩০৭ মেট্রিক টন। রাবার উৎপাদন সম্পর্কে এই পর্যায়ে প্রাপ্ত সংখ্যা দেশের মোট রাবার উৎপাদনের প্রতিফলক নয়। কেননা, দেশের রাবার উৎপাদনের প্রায় সর্বাংশই গৃহস্থালির বাইরে সংজ্ঞায়িত বন এলাকায় হয়ে থাকে।


এই জরিপে এটাও বিদিত হয়েছে যে ৫ শতাংশ বা তার বেশি জমি সংবলিত গৃহস্থালির মধ্যে শতকরা ৮.১ ভাগে কোন গাছগাছালি নেই এবং মাত্র শতকরা ৩.১ ভাগ গৃহস্থালিতে পরিকল্পিতভাবে গাছগাছড়া রোপণ ও লালন করা হচ্ছে; শতকরা ২১.৬ ভাগ গৃহস্থালিতে বাড়ির বাইরে অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে ওঠা বনরাজি রয়েছে। এই তিনটি তথ্য গৃহস্থালি পর্যায়ে অধিকতর ও বিস্তৃততর গাছগাছালি রোপণ ও লালনের বড় পরিধির বিদ্যমানতা নির্দেশ করে।


এ জরিপে প্রাপ্ত তথ্যাদির আলোকে এ সুস্পষ্ট হয়েছে যে বাংলাদেশে গৃহস্থালি পর্যায়ে শহরে এবং গ্রামে গাছগাছালির সংখ্যা বেশ কম। যে শ্যামল বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি আমাদের সামনে যুগ যুগ ধরে ধরা আছে তা ক্রমান্বয়ে দ্রুতগতিতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

জরিপে এটাও সুস্পষ্ট হয়েছে যে, গৃহস্থালি পর্যায়ে শহরে ও গ্রামে জ্বালানি কাঠের অভাব প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়ে আসছে। যদি এর সঙ্গে ফসল উৎসারিত খড়-কুটার জ্বালানি হিসেবে সরবরাহ কমে আসে তাহলে সার্বিকভাবে গৃহস্থালি পর্যায়ে জ্বালানির এ অভাব প্রকটতর হবে।

এ জরিপে প্রাপ্ত এ সব তথ্যাদির ভিত্তিতে বাংলাদেশে গৃহস্থালি পর্যায়ে বনায়ন বিস্তৃতকরণের বা গাছগাছালির সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যে কতিপয় পদক্ষেপ নেয়া জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এক. গৃহস্থালি পর্যায়ে বনায়নকে ব্যাস্টিক ও সামষ্টিক কর্মসূচী ও দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। গৃহস্থালিতে লভ্য জমির পাশাপাশি গ্রাম, ইউনিয়ন ও থানা পর্যায়ের বিস্তৃত সড়কগুলোর দু’ধারে পরিকল্পিতভাবে বনায়ন কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

 আমরা চাঁদপুরের কচুয়া থানায় সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচী নামক এক অসরকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ১০ বছরে কয়েক কোটি টাকা কাঠ-গাছ রোপণ-পরিচর্যা করার পরে পরিপক্বতার চক্র অনুযায়ী সেগুলো বিক্রি করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে বিতরণ করতে সমর্থ হয়েছি। এ কার্যক্রমের আওতায় সড়কের পাশের গ্রামে বসবাসরত স্বল্পবিত্ত বা বিত্তহীন পুরুষ ও নারীরা একেকজনে সড়কের দু’পাশে অসরকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক রোপিত নির্দিষ্ট সংখ্যক গাছের পরিচর্যা প্রায় ১০ বছর ধরে করেছেন এবং পরে সেসব গাছ বিক্রি করে যে আয় পাওয়া গেছে তার শতকরা ৬০ ভাগ নিজেরা নিয়েছেন, ২০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট অসরকারী প্রতিষ্ঠানকে গাছ কেটে নেয়া স্থানে আবার নতুন করে গাছ লাগাতে দিয়েছেন এবং বাকি ২০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদকে দিতে পেরেছেন। 

প্রতি বর্গমাইলের সড়ক নিবিড়তা বাংলাদেশে পৃথিবীর মধ্যে সবচাইতে বেশি। এ সব সড়কের দু’পাশে বন সৃষ্ট করলে তা কেবল সড়ক রক্ষণে নয়, যথা প্রয়োজন বনরাজি সৃষ্টি করে দেশের প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা বাড়ানোয় এবং অধিকতর বৃষ্টিপাত ঘটানোয় সহায়ক হবে। এ ধরনের কার্যক্রম দেশের সর্বত্র গ্রহণ করলে সামাজিক বনায়নের সঙ্গে গৃহস্থালির বনায়নও বিস্তৃত হবে।


দুই. গৃহস্থালি বনায়ন সকল পর্যায়ে বাড়ানোর লক্ষ্যে গ্রামে গ্রামে নার্সারি বা বীজাগার প্রতিষ্ঠা করা কর্মানুগ হবে।

নার্সারি স্থাপনকে অধিকতর বিস্তৃত ও ত্বরান্বিত করে গৃহস্থালি ও সামাজিক বনায়নের জন্য প্রয়োজনীয় গাছের চারা সহজতর ও সুলভতরভাবে লভ্য হবে।

তিন. দেশে জ্বালানি কাঠ এবং গৃহস্থালি নির্মাণ ও আসবাবপত্র নির্মাণে কাঠের ব্যবহার যৌক্তিকভাবে কমাতে হবে। এ লক্ষ্যে জ্বালানি হিসেবে কাঠের ব্যবহারকে কমানোর জন্য ধানের তুষ ও খড়-কুটা মিশিয়ে আলকাতরার প্রলেপ দিয়ে অধিকতর শক্তিশালী জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবহার, সকল ইটের ভাটায় কাঠের পরিবর্তে দেশ থেকে আহরিত কয়লা প্রযুক্তকরণ, গৃহস্থালিতে বিশেষত শহরের গৃহস্থালিতে অনুরূপভাবে কয়লার ব্যবহার প্রচলিত ও বাড়ানো লক্ষ্যানুগ হবে। তেমনি বিজ্ঞান ও শিল্প সংস্থার গবেষণালব্ধ জ্বালানি সাশ্রয়ী চুলা ব্যবহার, বায়ো গ্যাস উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধির দিকে নজর দিতে হবে।

চার. আইন করে দেশে ফলদ গাছ সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ছাড়া কাটা নিষিদ্ধ করতে হবে। অনুরূপভাবে বনজ ও ভেষজ গাছ পরিপক্ব না হওয়ার আগে কাটার ওপর নিষেধাজ্ঞা কিংবা সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে হবে। শহরাঞ্চলে ফলদ, বনজ ও ভেষজ গাছের রোপণ ও পরিচর্যা বিস্তৃত এবং মালিকানা ও অবস্থান নির্বিশেষে সংশ্লিষ্ট পৌরসভা কিংবা সিটি কর্পোরেশনের অনুমতি ছাড়া এ সব গাছ কাটা নিষিদ্ধ করতে হবে। প্রয়োজনের মানদণ্ডে বাংলাদেশের বন-আবৃত ভূমির পরিমাণ অনেক কম। এ কমতির পরিমাণ কিয়দংশে বাড়ানো যেত যদি গৃহস্থালি পর্যায়ে বন-সম্পদ বা গাছগাছালি বেশি থাকত। পশ্চিমা ইউরোপের কতিপয় দেশে মালিকানা ও স্থান নির্বিশেষে গাছ কাটার ওপর এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা ঈপ্সিত ফল দিয়েছে।

পাঁচ. শহর ও গ্রামের গৃহস্থালি পর্যায়ে এবং অন্য কাজে প্রযুক্ত না হওয়া খালি জমিতে অধিকসংখ্যক গাছ রোপণ ও লালন করার অনুকূলে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপে এ ধরনের সামাজিক চেতনাবোধ প্রায় সে সব দেশের প্রায় সকল দেশের নাগরিকদের গাছ রোপণ ও লালন করার অনুকূলে প্রণোদিত করেছিল। ফলদ যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপ লক্ষণীয় কম সময়ে একটি সবুজ আবাসন সংবলিত মহাদেশে রূপান্তরিত হয়। জমির স্বল্পতা সত্ত্বেও বাংলাদেশকে এ ধরনের চেতনাবোধ হতে আমরা ঈপ্সিত মাত্রায় ও দ্রুততার সঙ্গে আবারও শ্যামল দেশে রূপান্তর ও রক্ষা করতে সক্ষম হব।
বৃক্ষ রোপণ করি সবুজ বাংলাদেশের জন্য

বৃক্ষ রোপণ করি সবুজ বাংলাদেশের জন্য



গাছ লাগান দেশ বাঁচান’। যানবাহনের গায়ে ও বন বিভাগের অফিসের দেয়ালে লেখা এ স্লোগানটি প্রায়শ চোখে পড়লেও দেশের সরকারি বনাঞ্চল দিন দিন ন্যাড়া হচ্ছে। তথাপি দেশের মানুষ আগের চেয়ে বৃক্ষ রোপণের ব্যাপারে উৎসাহিত হচ্ছে, যা একটি ইতিবাচক সাফল্য। 

দেশে জনসংখ্যার তুলনায় আবাদি জমির পরিমাণ এমনিতে কম, তার ওপর প্রতিবছর আবাসনের জন্য আবাদি জমি দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। তাই গাছ লাগানোর আগে কী জাতের গাছ লাগালে দেশ ও জাতির সার্বিক কল্যাণ সহ প্রাকৃতিক পরিবেশের সহায়ক হবে সে বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার। 

বর্ষা এলেই গাছ লাগানোর কথা আমরা অনেকেই ভাবি। কেউ বা বসতবাড়ির ভিটায় একটি বনজ, ফলদ কিংবা একটি ঔষধি গাছ অথবা বাণিজ্যিকভাবে বৃক্ষ বাগান অথবা জমির আইলে বা পুকুর পাড়ের ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন জাতের কাষ্টল উদ্ভিদ বা ফলদ-ঔষধি গাছ রোপণের ব্যাপারে সচরাচরই আমরা বলাবলি করি। 


কোন অঞ্চলের আয়তনের পরিবেশগত ভারসাম্যে ২৫% বনভূমি থাকা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে কেবলমাত্র ৭% বনভূমি রয়েছে। তাছাড়া পরিবেশ হানিকর গাছ লাগানো হলে ও সুফলের চেয়ে কুফল বয়ে আনবে। যেমন ইউকেলিপটাসসহ, একাশিয়া, আকাশমণি, মিজ্জাম, শিশু, মেহগনি, রেইনট্রি ইত্যাদি বিদেশি জাতের গাছ আমাদের দেশের আবহাওয়া ও পরিবেশ উপযোগী নয়। এবং পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। 

এসব গাছ অতিরিক্ত পানি পোষণসহ ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের মাটিকে শুষ্ক, অনুর্বর ও মরুময় করে তোলে। পুকুর পাড়ে লাগালে মাছ চাষ ব্যাহত হওয়াসহ পানিকে দূষিত করে। এসব গাছের নির্গত গ্যাসে বাতাস বিষাক্ত হওয়াতে আশেপাশে দেশীয় ফলের গাছে ফলধরা হ্রাস পাওয়াসহ বন্ধ হয়ে যায়। এ সব গাছে পাখি পর্যন্ত বাসা বাঁধে না। 

মোদ্দাকথা, সীমিত জায়গাতে শুধু কাঠের হিসেব করে বিদেশি জাতের গাছ লাগানোতে হীতে বিপরীত হয়ে দেখা দিচ্ছে, যার জন্য একদিন আফসোস করতে হবে। তাই প্রস্তাব হচ্ছে:

১. কাঠ এবং ফল একই বৃক্ষ থেকে পাওয়া যাবে এমন দেশীয় জাতের গাছ লাগান, যা আমাদের আবহমান বাংলার চিরন্তন প্রকৃতি ও পরিবেশকে রক্ষা করবে।

২. ভেষজ ঔষধি গাছ লাগান যাতে আমাদের ভেষজ ঔষধ শিল্পের উন্নতি ও প্রসার হবে।

৩. দৃষ্টিনন্দন ও পরিবেশ সহায়ক দেশীয় জাতের কাঠের গাছ লাগান।

৪. বনজ বৃক্ষের উপযুক্ত স্থান বনাঞ্চল তাই বনাঞ্চলে বনজ বৃক্ষ রোপণ করুন, আর সমতলে ফলের গাছ।

৫. জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধির বিষয়টি মাথায় রেখে খাদ্য, পুষ্টি প্রভৃতি চাহিদা মেটানোর বিষয়টিকে কাঠের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিন। কারণ আমাদের ভূমি দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।
ফলদ বাংলাদেশের আন্দোলন

ফলদ বাংলাদেশের আন্দোলন



'পাখি পাকা পেঁপে খায়'- এই বাক্য শৈশবে আমরা কে না আওড়েছি! একদিন বাংলায় এমন হাজারো পঙ্ক্তি-প্রবাদ ভরে ছিল ফলের গন্ধ-মাখামাখিতে। কারণ বাংলার ঘরে ঘরে, গ্রামে-শহরে ফল ছিল সহজাত। এখন মানুষই পায় না পাকা পেঁপে, আর পাখি তো পরের ব্যাপার। আর্থিক বিবেচনার বশে কেবল কাঠ গাছ রোপণের এক মহামারীতে পরিণত হয়েছে সমগ্র বাংলাদেশ। 

যেখানেই যাবেন সেখানেই কাঠ গাছের ভ্রান্ত জয়জয়কার। সেই সঙ্গে সামাজিক বনায়নের নামে মাইলের পর মাইল রাস্তা ও সরকারি জমিতে কেবল কাঠ গাছের সারি। সেখানে পাখিরা আসে না। তাতে কি মানুষের সত্যি উপকার? তাতে কি দেশ সত্যিই অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত দিক থেকে লাভবান? উত্তর- না।

সমস্যাটা কি শুধুই অর্থনৈতিক? না। সমস্যা আমাদের ক্রমে বদলে যাওয়া জাতীয় মানসিকতার, অভ্যাসের, দৃষ্টিভঙ্গির। বাংলার পলি মাটিতে সত্যিই সোনা ফলে, শুধু ফলানোর মানসিকতা দরকার। সেই অদম্য ইচ্ছা ও স্বপ্নকে বুকে নিয়ে একটি সংগঠন সারাদেশে কাজ শুরু করেছে। 

'ফলদ বাংলাদেশ' নামের এ সংগঠনটি গত চার বছর ধরে সারাদেশে ফলদ বৃক্ষরোপণ ও এ সংক্রান্ত সচেতনতায় কাজ করছে। 'ফলদ বাংলাদেশ'-এর পরিকল্পনা হলো সারাদেশে অন্তত পাঁচ কোটি ফলের গাছ লাগানো। কিন্তু দশকের পর দশক ধরে দেশে বহু সংগঠন, ব্যক্তি এবং সরকারি উদ্যোগে প্রচুর বৃক্ষরোপণের পরও তারা কেন বৃক্ষরোপণের কথা ভাবছে? কারণ দেশে বছরের পর বছর ধরে ভুল বনায়নের মাধ্যমে আমাদের জীববৈচিত্র্য, খাদ্যশৃঙ্খলা, পুষ্টি ও ভিটামিনের নিশ্চিত উৎসগুলো নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে। 

শুধু কাঠনির্ভর বৃক্ষরোপণ আমাদের ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক। তাই দেশের প্রতিটি জেলায় প্রতিটি বাড়িতে তারা সবাই মিলে ফলদ গাছ রোপণ করতে চায়। এ বিশাল কর্মযজ্ঞ মাত্র একটি উদ্যোগের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। তাই প্রতিটি মানুষ, পরিবার, সংঘ, সংস্থার অংশগ্রহণ প্রয়োজন। কিন্তু শুরুতেই তো আর প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত কর্মী বাহিনী তৈরি করা যায় না। তাই শুরু থেকেই সংগঠনটি ধীরে ধীরে তাদের কর্মী সংগ্রহ এবং গ্রামে গ্রামে গিয়ে ফল গাছ লাগানোর কাজ করছে। এ বর্ষায়ও তারা থেমে নেই। কর্মীদের ব্যক্তিগত এবং স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত অর্থ ও চারা সহায়তায় যার যা সাধ্যমতো সংগঠনটি বিভিন্ন জেলায় বিগত বছরগুলোর মতো এবারও পূর্বপরিকল্পিত গ্রামগুলোতে ফল গাছ রোপণের জন্য কাজ করছে। বাড়িতে বাড়িতে লিফলেট দিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করছে।

এখন আসা যাক মূল কথায়। কেন বাংলাদেশের জন্য জাতীয় বৃক্ষরোপণে এ মুহূর্ত থেকে কাঠ গাছকে প্রাধান্য দেওয়া থেকে বিরত হওয়া জরুরি? মেহগনি, ইউক্যালিপটাস, শিশু, রেইন-ট্রি, একাশিয়াই এখন আমাদের দেশের ৭০ ভাগ বৃক্ষ। কিন্তু এ গাছগুলোর কাঠ ছাড়া অন্য কোনো ব্যবহার নেই। এমনকি এসব গাছ আমাদের পরিবেশের জন্য উল্টো ক্ষতিকারক। অথচ দেশীয় ফল বৃক্ষগুলো হাত ভরে দেয় আমাদের। যদি আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠালের কথাই ধরি, এর সবকিছুই ব্যবহারযোগ্য- কাঠ অতি উন্নতমানের, পাতা পশুখাদ্য, ফল উপাদেয় পুষ্টিকর খাবার। তবু লাভজনক বিবেচনায় আমরা বাড়িতে-সড়কে রোপণ করছি মেহগনি। 

বাস্তবে দেখা গেছে যে কোনো হিসাবে ২০ বছরে একটি মেহগনি গাছ থেকে যদি ২০ হাজার টাকা লাভ করা যায়, কাঁঠাল থেকে আসবে নূ্যনতম ৬০ হাজার টাকা। আর গাছ তো শুধু টাকা নয়, কাঠ নয়; গাছ একটি প্রাণ, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের বহুমাত্রিক সম্পর্ক। ফলদ বৃক্ষের সঙ্গেই সেই সম্পর্ক হয়ে ওঠে মধুময়। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের ফলের দাওয়াত দেওয়া বা তাদের বাড়িতে গাছের ফল পাঠিয়ে দেওয়া বাঙালি সংস্কৃতিরই অংশ, যা এখন বিস্মৃতপ্রায়।

তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা ফলদ বৃক্ষ রোপণের মাধ্যমে দেশের পুষ্টির বার্ষিক ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে পারি সহজেই। উর্বর মাটি ও উপযোগী জলবায়ু থাকা সত্ত্বেও প্রচুর ফল আমদানির কারণে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা চলে যাচ্ছে বিদেশে। অথচ এই কোটি কোটি টাকার বাজার সহজেই দেশীয় সুস্বাদু ফলের হতে পারে। যা অনায়াসে আমাদের পুষ্টি ঘাটতি, রসনা তৃপ্তি, আর্থিক দৈন্য ঘুচাতে সহায়তা করবে। সেই সঙ্গে আম, লিচু, জাম, সফেদা, কাঁঠাল, গাব, তাল, তেঁতুল, জলপাই ছাড়াও বিভিন্ন ফল এবং ঔষধি গাছ হবে উন্নতমানের কাঠেরও উৎস।

আমাদের দেশে প্রচলিত যে কোনো কাঠ গাছের তুলনায় ফলের গাছে অন্তত তিন গুণ বেশি লাভ। পরিবেশের জন্যও উপকারী। আর স্থানীয়ভাবে ফলের পর্যাপ্ত জোগানই পারে ফরমালিনের মতো বিষাক্ত অভিশাপ থেকে আমাদের রক্ষা করতে।

আরেকটি মজার কিন্তু হৃদয়বিদারক ব্যাপার হলো, অধিকাংশ কাঠের গাছে পাখির কোনো খাদ্য নেই। পাখির বাসা বাঁধা এবং ঝড়-বৃষ্টিতে আশ্রয় নেওয়ার মতো উপযোগী ডালপালা নেই। তাই আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে দেশীয় পাখি, যা আমাদের ফসল উৎপাদনে ফেলছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। মানুষ বন উজাড় করে যতটা না পাখি তাড়িয়েছে- খাদ্যাভাবে, ফল না পাওয়ায় তারা নিজেরাই এ তল্লাটে আনাগোনা কমিয়ে দিয়েছে তার চেয়ে বহু গুণ।

দেশের ৪৭ ভাগ মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। পর্যাপ্ত ফল উৎপাদনের মাধ্যমে যার অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। কাজেই দেশ এবং আগামী প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য সুদূরপ্রসারী ভাবনা নিয়ে শুধু কাঠের গাছের বদলে ব্যাপক হারে ফলদ বৃক্ষরোপণ প্রয়োজন, যা এখন আমাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তাই কয়েকজন তরুণ মিলে গড়ে তোলা 'ফলদ বাংলাদেশ' সংগঠনটির আহ্বান- 'ফল গাছ লাগান, দেশ বাঁচান'। তাদের আহ্বান- আসুন, সবাই মিলে করি 'ফলদ বাংলাদেশ' আন্দোলন। আসুন প্রতি বর্ষায় নিজের ও আশপাশের বাড়ির আঙিনায় ফলের চারা রোপণ করি। 

কেন ফলবৃক্ষ রোপণ
- দেশের পুষ্টি ঘাটতি কমানো।
- ফলের আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা।
- স্থানীয়ভাবে ফলের জোগান বৃদ্ধি করে ফলে বিষ বা ফরমালিন প্রয়োগ বন্ধ করা।
- পাখিদের খাদ্য ও বাসস্থানের ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা।
- বৃক্ষকে শুধু কাঠ আর টাকা হিসেবে দেখার প্রবণতা ও কুফল হ্রাস করা।
- ফলবৃক্ষ মানুষের পারস্পরিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে, আত্মীয়-বন্ধুদের ফলের নিমন্ত্রণ দেওয়া বা তাদের বাড়িতে গাছের ফল পাঠিয়ে দেওয়া বাঙালি সংস্কৃতির অংশ। সেই সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনা।
- নিঃস্বার্থভাবে অপরের মঙ্গল কামনার অভ্যাস তৈরি করা।
- বিদেশি ক্ষতিকর বৃক্ষের বদলে আমাদের উর্বর মাটিতে উপযোগী বৃক্ষকে প্রাধান্য দেওয়া।
- ফলদ বৃক্ষের বহুমুখী উপকারিতা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা।
- বিষমুক্ত বিশুদ্ধ পুষ্টি লাভের স্বাধীন ক্ষেত্র তৈরি করা।


পাঁচটি গাছকে 'না' বলুন

- ইউক্যালিপটাস। কারণ অতিমাত্রায় পানি শোষণকারী, নিম্নমানের কাঠ, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
- রেইন-ট্রি। কারণ এই আগ্রাসী গাছ অন্য গাছকে বাড়তে দেয় না, ঝরা পাতা ফসল ও মাছের জন্য ক্ষতিকর, কাঠও নিম্নমানের।
- মেহগনি। এর ফল বিষাক্ত। পুকুরের পানিতে পড়লে মাছ মরে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। অত্যধিক রোপিত হওয়ায় পরিবেশের ভারসাম্য হুমকির মুখে। এর কাঠ ছাড়া অন্য কোনো ব্যবহার নেই।
- শিশু। কারণ এর কাঠ মাঝারি মানের, প্রকৃতি ও মানুষের সঙ্গে অন্য কোনো সম্পর্ক নেই।
- একাশিয়া। কারণ এর মাইক্রোস্কোপিক রেণু অ্যালার্জি/অ্যাজমার অনুঘটক, কাঠ মাঝারি মানের, গঠন আঁকাবাঁকা, বাংলাদেশে অতিরিক্ত রোপিত।
কাঠ উৎপাদনকারী উদ্ভিদ

কাঠ উৎপাদনকারী উদ্ভিদ



জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাঠের গুরুত্ব অপরিসীম। কাঠ বলতে বুঝায় যে সকল গাছ জ্বালানী ছাড়া বাড়িঘর নির্মাণ, আসবাবপত্র তৈরী, জাহাজ ও ব্রীজ তৈরীতে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশ জীববৈচিত্রে সমৃদ্ধ একটি দেশ। এদেশে প্রায় ৫০০০ উদ্ভিদ প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদ রয়েছে প্রায় ৯১৫ টি বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদ প্রজাতি দেশের বনাঞ্চলগুলোর প্রধান উপাদান, বৃক্ষপ্রজাতির প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ গুরুত্ব রয়েছে। 

সকল বৃক্ষ প্রজাতি হতে ভালো মানের কাঠ পাওয়া যায় না বিধায় অনেক বৃক্ষ প্রজাতির পরিচিতি কম। বাংলাদেশের বর্ধিত জনসংখ্যার চাহিদা মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত কাঠ জোগান দিতে এদেশের কাঠ উৎপাদনকারী উদ্ভিদের উপর চাপ পড়বে। 

বানিজ্যিকভাবে ৪০-৫০ প্রজাতি কাঠ উৎপাদনকারী উদ্ভিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসলেও আরো অনেক প্রজাতি রয়েছে যাদের কাঠের গুনগত মান ভালো। এসব কাঠ বাড়িঘর নির্মাণ, আসবাবপত্র তৈরীতে ব্যবহার করা যায়। 

৩৪২ টি প্রজাতির বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদ ফরেস্ট ইকোসিস্টেমের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বাংলাদেশ ন্যাশনাল হারবেরিয়াম বাংলাদেশে জন্মে এমন ২২৯ টি কাঠ উৎপাদনকারী উদ্ভিদ প্রজাতির তালিকা প্রণয়ন করেছে এবং এদের কাঠের গুনাগুন বিশ্লেষণ করেছে।  এই লিংকে তাদের তথ্য রয়েছেঃ

http://www.bnh.gov.bd/site/page/feab1654-0852-4ca5-a2ba-fe566b866d3a/%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%A0-%E0%A6%89%E0%A7%8E%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A6%A8%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%80-%E0%A6%89%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AD%E0%A6%BF%E0%A6%A6
ঢাকা শহরের বৃক্ষ

ঢাকা শহরের বৃক্ষ

ইট-পাথরের চাপায় ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে ঢাকার সবুজ রূপ। প্রতিদিন নতুন নতুন বহুতল ভবনের   ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হচ্ছে আর কেটে ফেলা হচ্ছে পুরনো বাড়ির চারপাশ দিয়ে থাকা গাছ। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ক্রমশই হারিয়ে যাচ্ছে বৃক্ষতলের শীতল ছায়া।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি জনপদে জনগণের তিনগুণ গাছ থাকা দরকার। 

ঢাকা অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি ও গাছপালা
মৃত্তিকাবিদদের মতে, ঢাকা শহর ব্রহ্মপুত্রবাহিত পলি অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। মাটি দো-আঁশ ও অম্লাভাবাপন্ন। পিএইচ-৫ থেকে ৬ দশমিক ৮ পর্যন্ত। কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও সিলেটের সমতল, মধুপুর বাদে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ এবং মধুপুর বাদে ময়মনসিংহের প্রায় ১৬ হাজার বর্গমাইল এ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। এখানে সাধারণত নারিকেল, আম, জাম, মেহগনি, শিশু, রেইনট্রি, শিমুল, কদম, নিম ও জলপাই গাছের দেখা বেশি পাওয়া যায়। তবে ঢাকা শহরে বলধা গার্ডেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রমনাসহ বেশকিছু এলাকায় দুর্লভ কিছু গাছের দেখা মেলে।


ঢাকা শহরের নিসর্গ ইতিহাস
নিসর্গ শিল্পী অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মার ভাষায়, ‘সূর্যালোকিত মৌসুমী-বিধৌত আমাদের দেশ জীবননন্দনতত্ত্বের অজস্র আকর্ষী উপাদানে সমৃদ্ধ।’ 

বাংলাদেশের রূপ মানেই সবুজে ঢাকা তরুপল্লবের এক মহামেলা। ঢাকা শহরও এর ব্যতিক্রম ছিল না। যখন থেকে এ শহর নগরে রূপ নেয়া শুরু করে তখন থেকে এখানে উদ্যানচিন্তার উন্মেষ ঘটা শুরু।

মুঘলরাই এ উপমহাদেশে উদ্যানের ধারণা নিয়ে আসে প্রথম। সম্রাট বাবর নিজেই ছিলেন এর অগ্রপথিক। তিনি বলেন, ‘আমি যে সমস্ত উদ্যান ও প্রাসাদ নির্মাণ করিয়াছি তাহাতে সমতা রক্ষার কোনো ত্রুটি রাখিনাই। প্রত্যেক কোণে সুসামঞ্জস্য উদ্যান তৈরি করিয়াছি এবং তাহাতে নির্ভুল সৌষম্যে গোলাপ ও নার্সিসাস লাগাইয়াছি।’ মুঘলরা স্বভাবতই তাদের প্রিয় মধ্য এশীয় গাছপালা এদেশে রোপণ করেছেন। এ সময়ই আজকের রমনা এলাকায় ‘বাগ-এ বাদশাহ’ নামে একটি উদ্যান প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। পরে সুবা বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত হলে এ অঞ্চলের নিসর্গ পরিণত হয় জঙ্গলে।

ইংরেজ আমলে এ অঞ্চল জঙ্গলেই ঢেকে থাকে। পরে ১৮২৫ সালে রমনাকে রেসকোর্স করা হয়। ঢাকা শহরে নিসর্গ প্রতিষ্ঠার মূল কাজ শুরু হয় একটি রাজনৈতিক পটভূমিকায়। অধ্যাপক শর্মার ভাষায়, ‘১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ এবং পূর্ববঙ্গ ও আসামের সংযুক্তি পরিকল্পনায় ঢাকায় নতুন প্রদেশের রাজধানী নির্মাণের অসম্পূর্ণ উদ্যাগের ফল রমনা গ্রীন। ঢাকা শহরের নিসর্গ-পরিকল্পনার কাজ শুরু হয় ১৯০৮ সালে লুই প্রাউডলকের হাত ধরে।’


ঢাকার কোথায় কী পরিমাণ গাছ আছে
ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকার আয়তন ৩০৪ বর্গকিলোমিটার। এই আয়তনের ঠিক কতভাগ গাছ আছে তার কোনো হিসাব নেই বনবিভাগ বা সিটি করপোরেশনে। ঢাকা সামাজিক বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা উম্মে হাবিবা বলেন, ঢাকা শহরে গাছের কোনো পরিসংখ্যান কখনোই করা হয়নি। এজন্য বলা যাচ্ছে না ঠিক কতভাগ এলাকায় গাছ আছে।

ঢাকা শহরে মূলত বোটানিক্যাল ও বলধা গার্ডেনের পাশাপাশি রমনা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কোতোয়ালি থানা, তেজগাঁও, শেরে বাংলানগর অঞ্চলেই গাছের দেখা পাওয়া যায়। ঢাকা মহানগরীর ২১ টি থানার পূর্বতন হিসাব মধ্যে কেবল তেজগাঁও, কোতোয়ালি ও রমনা থানাতে মোট ৯টি উদ্যান আছে। বাকি অঞ্চলে শুধু ইট-পাথরের বাড়ি ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। বনবিভাগের সূত্র মতে, মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে ৭৫ হাজার ও বলধা গার্ডেনে প্রায় ১৭ হাজার গাছ আছে। আরবরিকালচারের এক সূত্র মতে, রমনা উদ্যানে ৫০৫০টি ও সোহরাওয়ার্দীতে ৩ হাজার ৫শটি গাছ আছে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আরবরিকালচারের হিসাব অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গাছ আছে প্রায় ৫ হাজার। ওসমানী উদ্যানে গাছের কোনো হিসাব নেই সিটি করপোরেশনের কাছে। সিটি করপোরেশনের অধীনে থাকা ধানমন্ডি লেক  পাড়ে আছে ৪ হাজার ৮শ ৭০টি গাছ। বঙ্গভবনে ৮ হাজার ৭শ ৮২টি গাছের হিসাব পাওয়া গেলেও পাওয়া যায়নি গণভবন, চন্দ্রিমা উদ্যান ও সংসদ ভবন এলাকার গাছের সঠিক হিসাব। 



বোটানিক্যাল গার্ডেন
দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও জিনপুল তৈরির উদ্দেশ্যে ১৯৬১ সালে মিরপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান বা বোটানিক্যাল গার্ডেন। ২০৮ একর জায়গা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত এ উদ্যানে সর্বশেষ ১৯৯৩ সালে করা একটি হিসাব অনুযায়ী ৯৭৭ প্রজাতির প্রায় ৭৫ হাজার গাছ আছে। এর মধ্যে ২৫৫ প্রজাতির ২৮ হাজার ২শ বৃক্ষ, ৩১০ প্রজাতির ৮ হাজার ৪শ গুল্ম ও ৩৮৫ প্রজাতির ১০ হাজার ৪শ বিরুৎ জাতীয় গাছ আছে। এখানে বেশকিছু দেশি-বিদেশি বিরল প্রজাতির গাছের দেখা পাওয়া যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অ্যানথোনিয়া, আগর, ব্রেড ফ্রুট, পুনর্নভা, আকন্দ, ওল্ডম্যান ক্যাকটাস, কর্পূর, খরগোশ ফার্ন, তমাল, ডামবিয়া, ভূজ্জপত্র, মাধবী, কানাইডিঙ্গা, ট্যাবেব্যুয়া, কালোকেশি, অনন-মূল, সাদা রঙ্গন, বড় চম্পা, কারিলিফ, ছোট মুসান্ডা, রামবুতাম, ক্যান্ডল গাছ প্রভৃতি।


বলধা গার্ডেন
বলধা গার্ডেন সূত্রে জানা যায় ১৯০৯ সালে বলধা এস্টেটসের তৎকালীন জমিদার, বিশিষ্ট প্রকৃতিপ্রেমিক নরেন্দ্র নারায়ণ রায়চৌধুরী কর্তৃক পুরাতন ঢাকা ওয়ারীতে প্রতিষ্ঠিত বাগানই আজকের ঐতিহ্যবাহী বলধা গার্ডেন। বর্তমানে এটি জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের একটি স্যাটেলাইট ইউনিট। ২০০২ সালে করা হিসাব অনুযায়ী এ বাগানে ৬৮৯ প্রজাতির প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার গাছ আছে। এর প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে শঙ্খনদ পুকুর, আমাজান লিলি, ক্যামেলিয়া, স্বর্ণ অশোক, প্যাপিরাস, চামেলি, হাপারমালি, হংসলতা, আফ্রিকান টিউলিপ, লতা গন্ধরাজ, কনকচাঁপা, জহুরিচাঁপা, ক্রিমফ্রুট, কুরচি, মাধবী, হলুদ, নীল, লাল ও সাদা জাতের শাপলা, বিরল প্রজাতির ক্যাকটাস ও অর্কিড, ভূজ্জপত্র। এখানকার উল্লেখযোগ্য বিরল প্রজাতির গাছগুলো আছে বাগানের সাইকি অংশে যেখানে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। সিবলী অংশ সাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে ১২টা এবং বিকেল ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত।


রমনা পার্ক
ঢাকার ফুসফুস নামে খ্যাত আজকের রমনা পার্ক ৬৮ দশমিক ৫ একর জমি ও ৮ দশমিক ৭৬ একর ঝিল নিয়ে গড়ে ওঠে ১৯৫২ সালে। জানা গেছে, কলকাতার ইডেন গার্ডেনের অন্যতম নির্মাতা প্রয়াত ফজলুল করিমের হাতেই এর সূচনা। তবে বৃক্ষ-লতা নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠন ‘তরুপল্লব’-এর সেক্রেটারি মোকারম হোসেন বলেন, ‘যতদূর জানি ফজলুল করিমের হাতে ইডেন গার্ডেন একটি শৈল্পিক সৃষ্টি। নিখুঁত নকশায় সাজিয়েছিলেন তরুশোভা। কিন্তু রমনা পার্কে এখন বৃক্ষ রোপণের যে নৈরাজ্য দেখি তা নিশ্চয়ই ফজলুল করিমের পরিকল্পনার অংশ ছিল না।’


পার্কের বিভিন্ন বয়সী, বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা সুদীর্ঘ সময়ের ফসল। বৈচিত্র্য থাকায় সারাবছরই কিছু না কিছু ফুল থাকে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৫০৫০টি গাছ আছে পার্কে। উল্লেখযোগ্য হচ্ছে : পাদাউক, পলাশ, ধারমার, কাউয়াতুতি (বনপারুল), আগর, জ্যাকারান্ডা, তমাল, বাওবাব, গ্লিরিসিডিয়া, কর্পূর, স্কারলেট কর্ডিয়া, জহুরিচাঁপা, ক্যাশিয়া জাভানিকা, মাধবী, মালতী, আফ্রিকান টিউলিপ, কেয়া, অশোক, ট্যাবেবুয়া, পাখি ফুল, কফি, উদয়পদ্ম, সহস্রবেলী, লাঙ্কাস্টারি ফুরুস, গোল্ডেন শাওয়ার, পালাম, কাউফল, ঝুমকো, লতা পারুল, স’লপদ্ম, মহুয়া, কুর্চি, বন আসরা, চন্দন, মাকড়িশাল, দুলিচাঁপা, কনকচাঁপা ইত্যাদি।


রমনা পার্কের অতীত বর্তমান
ঐতিহাসিক তাইফুর জানিয়েছেন, মূলত মুঘলরাই রমনা নামটির প্রবক্তা। ‘বাগ-ই-বাদশাহ’ নামে তখন একটি বাগান নির্মাণ করা হয়েছিল বর্তমান হাইকোর্ট থেকে সড়ক ভবন পর্যন্ত এলাকা নিয়ে। রমনা পার্কের বোর্ডে লেখা তথ্য থেকে জানা যায়, ১৬৬০ সাল থেকেই এলাকাটি রমনা নামে পরিচিত। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পরে বাগানটি ধ্বংস হয়ে যায়। ঢাকা থেকে সুবা-বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত হলে এই অঞ্চলটি জঙ্গলে ঢেকে যায়। ইংরেজ আমলে ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ডস রমনা উদ্ধারে হাত দেন। ১৮২৫ সালে জেলের কয়েদিদের দিয়ে তিনি রমনা পরিষ্কার করে সেখানে রেসকোর্স প্রতিষ্ঠা করেন। 

পঞ্চাশের দশকের পর এটি আবারো জঙ্গলে ঢেকে যায়। বঙ্গভঙ্গের সময় ঢাকায় রাজধানী গড়ে তোলার জন্য এ অঞ্চলের সংস্কার শুরু করে। এ সময় আজকের রমনা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পুরনো ভবনগুলো নির্মাণ করা হয়। ১৯০৮ সালের দিকে রমনাসহ ঢাকা শহরের নিসর্গ পরিকল্পনার কাজ শুরু করেন লন্ডনের কিউ বোটানিক গার্ডেনের অন্যতম কর্মী রবার্ট লুই প্রাউডলক। তার তত্ত্বাবধানেই গড়ে ওঠে রমনাকেন্দ্রিক নিসর্গশোভা। তিনি বিশ্বের অন্যান্য উষ্ণম-লীয় অঞ্চলের সুদর্শন বৃক্ষ ঢাকায় এনে রোপণের ব্যবস্থা করেন। তার এই সদিচ্ছার কারণেই এ অঞ্চলের উদ্ভিদসম্ভার বেশ সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। আজকের রমনা পার্কটির প্রতিষ্ঠা হয় আরো পরে ১৯৫২ সালে।


নিসর্গপ্রেমিক মোকারম হোসেন পার্কের বর্তমান অবাস্থা দেখে দারুণভাবে হতাশ। তিনি সাপ্তাহিক ২০০০- কে বলেন, প্রয়াত ফজলুল করিম নিশ্চয়ই এভাবে পার্কটি গড়তে চাননি। ক্রমেই খালি জায়গার পরিমাণ কমে আসছে। যত্রতত্র ইচ্ছামতো লাগানো হচ্ছে গাছপালা। তাতে পার্কের সৌন্দর্যহানি ঘটছে। খোঁড়া যুক্তিতে যখন তখন কেটে ফেলা হচ্ছে গাছ। এ ভাবেই হারিয়ে গেছে শতবর্ষী মালতী লতা ও কনকচাঁপাসহ অনেক গাছ, মৃত্যুর প্রহর গুনছে প্রতি বর্ষায় ফুল ফোটানো কেয়াটি। সঠিক উপস্থাপনার কারণে লেকটিও কেমন বেমানান মনে হয়। কোথাও কোনো জলজ ফুলের ছিঁটেফোঁটাও চোখে পড়ে না।


সোহরাওয়ার্দী
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের স্মৃতিবিজড়িত রেসকোর্স ময়দানই আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। স্বাধীনতার অনেক পরে এ ময়দানকে উদ্যানে রূপ দেওয়া হয় বলে জানা যায়। যদিও এ উদ্যানে অপরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানোর অভিযোগ রয়েছে। এখানে ১০৩টি প্রজাতির সর্বমোট ৩ হাজার ৫শটি গাছ আছে বলে জানা গেছে। এ উদ্যানে উল্লেখযোগ্য গাছ হচ্ছে মিলেশিয়া, নাগলিঙ্গম, বুদ্ধ নারিকেল, পলাশ, সেতু শিমুল, হিজল, কদম, স্বর্ণচাপা, কদবেল, বিলেতি গাব, বড়বেল, আমলকি, হরিতকি, বহেরা, নাগেশ্বরচাঁপা।


বঙ্গভবন, গণভবন ও সংসদ ভবন এলাকার গাছ
বঙ্গভবনসহ সব সরকারি ভবন ও স্থাপনার গাছ পরিচর্যা ও সংরক্ষণ করে থাকে গণপূর্ত বিভাগের আরবরিকালচার বিভাগ। ঐতিহ্যবাহী ভবন বঙ্গভবনের গাছও ইতিহাসের অন্যতম সাক্ষী। এ ভবনে মোট ১৫২  প্রজাতির মোট ৮ হাজার ৭শ ৮২টি গাছ আছে। এরমধ্যে ফলজ গাছের সংখ্যা ২,২৪৫, বনজ ৯১৭, শোভাবর্ধনকারী ৫২৪০ এবং ঔষধি গাছ আছে ৩৯০টি। উল্লেখযোগ্য গাছ হচ্ছে কদবেল, গুলানচি, কাজুবাদাম, বিলিম্বি, মিষ্টি তেঁতুল, কাউফল, নাগেশ্বর, ফাইকাস, কেশিয়া সায়মা, একাশিয়া, রাবার প্লান্ট, শিমুল, বোতলব্রাশ, অপরাজিতা, উইপিং দেবদারু, নীলমনি লতা, নীল কণ্ঠ, মোসেন্ডা, সোনালু, ম্যাগনোলিয়া, কাঞ্চন, হৈমন্তী, সাইকাস পাম। গণভবন, চন্দ্রিমা উদ্যান ও সংসদ ভবন এলাকার গাছের সঠিক কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে আরবরি কালচার শেরেবাংলা সাবডিভিশনের কর্মকর্তা আমিরুল বাহরাইন জানান, চন্দ্রিমা উদ্যানের অধিকাংশ গাছ আকাশি। এ ছাড়া সেখানে জারুল, বোতল ব্রাশ, কৃষ্ণচূড়া, পেয়ারা, খেজুর ও ক্যান্টিয়া পামগাছ আছে। সংসদ ভবনের উত্তর প্লাজায় আছে রানীচূড়া, ইউক্যালিপটাস, মুসুন্ডা, একজোড়া, রঙন, কাঞ্চন, পলাশ। বোতল ব্রাশ, শিমুল, খেজুর, কামিনী, দেবদারু, সোনালু, বোতল পাম গাছ আছে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। পাশের ফুটপাথে আছে ফিসটেইল পাম ও শিশু গাছ।


সিটি করপোরেশনের উদ্যান ও পার্ক
২২ দশমিক ১০ একর জায়গার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ওসমানী উদ্যান ও ধানমন্ডি লেকের দেখভাল করে ঢাকা সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৫। নগরভবনে অবসি’ত এ অঞ্চলের অফিসে এ উদ্যান ও লেকের গাছের ব্যাপারে কোনো তথ্য নেই। এর সঙ্গে ৯টি উদ্যানসহ ৫৪টি পার্কের তালিকা সিটি করপোরেশনের তালিকায় থাকলেও এসব পার্ক ও উদ্যানে কোন কোন প্রজাতির কী পরিমাণ গাছ আছে, গাছের সংরক্ষণ কীভাবে হচ্ছে, মাঝে মাঝে গাছ মারা গেলেও তা কেন মারা যাচ্ছে? এসব ব্যাপারে কোনো তথ্য নেই নগরভবন বা আঞ্চলিক অফিসগুলোতে। সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা জানান, কোথাও গাছ মরে গেলে বা ঝড়ে পড়ে গেলে তা সরিয়ে রাসত্মা বা পার্ক পরিষ্কার করে দেওয়াই সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব। আরেক কর্মকর্তা বলেন, আলস্নাহর দেওয়া গাছ… কোনো হিসাব নেই। দায়িত্ব আছে তাই দেখাশোনা করি। সিটি করপোরেশনের অপর এক সূত্র জানিয়েছে, একসময় সিটি করপোরেশনে আরবরি কালচার নামে একটি বিভাগ ছিল যা বর্তমানে নেই। কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকার গাছ দেখাশোনা করার মতো কোনো বিভাগ নেই। নেই কোনো উদ্ভিদবিদ বা বনকর্মকর্তা। তবে অঞ্চল-৫ এর কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া ৩ দিন সময় নিয়ে ধানমন্ডি লেকের গাছ গণনা করে জানিয়েছেন সেখানে মোট গাছের সংখ্যা ৪ হাজার ৮শ ৭০টি।


বিউটিফিকেশন ও রাস্তার গাছ
ঢাকা শহরের রাস্তার সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য দায়িত্ব দেওয়া আছে ১২৯টি প্রতিষ্ঠানকে। এসব প্রতিষ্ঠান মূলত রাস্তার মাঝখানে ডিভাইডার দিয়ে ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগিয়েছে। অভিযোগ আছে এসব প্রতিষ্ঠান গাছের যথাযথ পরিচর্যা নেয় না। অনেক সড়কদ্বীপেই চোখে পড়বে বট, পাকুড়, মেহগনির মতো বৃহৎ গাছের চারা। এসব চারার ভবিষ্যৎ কী কেউ জানে না। ঢাকা সিটি করপোরেশনের সৌন্দর্যবর্ধনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিপন কুমার সাহা বলেন, আগে কোনো এক প্রেক্ষাপটে গাছগুলো লাগানো হয়েছিল। এখন তো আর হুট করে গাছগুলো কাটা যাচ্ছে না। বর্তমানে আমরা সচেতন এব্যাপারে। কোথায় কোন ধরনের গাছ লাগানো হচ্ছে তা আমরা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছি। তবে এভাবে রাস্তার মাঝখান দিয়ে গাছ লাগানোর বিরোধিতা করলেন উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, এভাবে অপ্রশস্ত জায়গায় গাছ লাগিয়ে মূলত ওই গাছকে একটি বেঁচে থাকার যুদ্ধের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়। অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা এ ব্যাপারে বলেন, ‘উন্নত বিশ্বের কোথাও এভাবে      রাস্তার মাঝখান দিয়ে গাছ লাগানোর নজির নেই। আমি একদিন এক রিকশাওলাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, সে বলেছিল, ‘স্যার এ গাছগুলো তো মানুষকে ছায়া দেওয়ার জন্য নয়, রাস্তাকে ছায়া দেওয়ার জন্য।’ তবে তিনি ঢাকার ফুটপাথেও গাছ লাগানো সম্ভব কি না এ প্রশ্নে হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, ‘ঢাকার ফুটপাথ তো হকারদের দখলে। হাঁটার জো নেই। কোথায় তুমি গাছ লাগাবে?’

রমনা, তেজগাঁও, কোতোয়ালি, শেরে বাংলানগর থানাসহ শহরের রাস্তার দুপাশ দিয়ে যেসব গাছ আছে সেগুলোর কোনো সঠিক হিসাব নেই ঢাকা সিটি করপোরেশনের কাছে। নগরভবন সূত্রে জানা যায়, এসব গাছ মারা গেলে বা ঝড়ে পড়ে গেলেই কেবল তা অপসারণের দায়িত্ব পালন করে সিটি করপোরেশন।

সামাজিক বনায়নের হালচাল
ঢাকা সামাজিক বন বিভাগ ১৯৯৩-৯৪ অর্থবছরে সিটি করপোরেশন এলাকায় বিভিন্ন রাস্তা, প্রতিষ্ঠান ও পার্ক বা ব্লক বাগানে মোট গাছের চারা রোপণ করেছে ২৭ হাজার তিনশ ৬৪টি। বনবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এর মধ্যে বর্তমানে ৫৫ ভাগ গাছ বেঁচে আছে। ৯৪-৯৫ অর্থবছরে চারা রোপণ করা হয়েছে ৮৬ হাজার ৯৪টি। এর মধ্যে বর্তমানে বেঁচে আছে প্রায় ৪৪ ভাগ গাছ। এ সময় রোপিত গাছের মধ্যে গোলাপবাগ স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় লাগানো ১৫০০ গাছ, ধানমন্ডি ক্লাব মাঠ এলাকার ২৬০ গাছ, খিলগাঁও মডেল কলেজ মাঠের ৩৭৫ গাছ, খিলগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের ১১০ গাছ, আলী আহমদ উচ্চ বিদ্যালয় এলাকার ৪০০ গাছ, বরম্নড়া হাইস্কুলের ৫০০টি গাছ এবং মান্ডা দক্ষিণখান এলাকার ১২৪৫টি গাছের মধ্যে একটিও বেঁচে নেই। ৯৫-৯৬ অর্থবছরে সামাজিক বন বিভাগ ঢাকা শহরে গাছ লাগিয়েছে ৩৯ হাজার ১শ ৮৪টি। এর মধ্যে বেঁচে আছে ৪১ ভাগ গাছ। ৯৬-৯৭ অর্থবছরে গাছ লাগানো হয়েছে ১৩ হাজার ৩শ ৩২টি। বেঁচে আছে শতকরা ৪৬ ভাগ। এরপর ঢাকা শহরে গাছ লাগানো হয়েছে ২০০১-০২ অর্থবছরে তেজগাঁও থানায় ১০০টি এবং ২০০২-০৩ অর্থবছরে মোট ৪৫ হাজার ৪শ ৫০টি গাছ। এরপর ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় আর কোনো গাছ লাগায়নি বলে নিশ্চিত করেছে ঢাকা সামাজিক বন বিভাগ ।


ভালো নেই ঢাকার গাছ
ঢাকা শহরে এখনো যত গাছ আছে সেগুলোও ঝুঁকিপূর্ণ। মাঝে মাঝেই মারা যাচ্ছে এসব গাছ। পার্ক ছাড়াও রাস্তার দুপাশের গাছ মারা যাচ্ছে নানা কারণে। ঢাকা বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়, পুলিশ হেডকোয়ার্টারের সামনে ১টি, হাইকোর্ট এলাকায় ৪-৫টি, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশ পথে, নির্বাচন কমিশনের উত্তর দিকের প্রবেশ পথে এবং নির্বাচন কমিশনের রাস্তার পাশে ৯-১০টি, মোহাম্মদপুর হাউজিং-এ ১টি, জুরাইন কবরস্থানে ১টি, উত্তরা বনবীথি কমপ্লেক্সের দক্ষিণ দিকে এবং আবদুল্লাহপুর এলাকায় বেশ কয়েকটি রেইনট্রি গাছ সম্প্রতি মারা গেছে। অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা এ ব্যাপারে বলেন, ঢাকার বাতাস, পানি ও মাটি দূষিত হয়ে গেছে। রাস্তা-ঘাট সব কংক্রিটে ঢেকে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি ঢুকতে পারছে না মাটিতে। অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে মাটিতে। অধ্যাপক শর্মার কথার সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায় রাস্তায় নামলেই। রাস্তার ফুটপাথে যে দুই একটা গাছ আছে সেগুলোর চারপাশ ইট সিমেন্টে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এসব গাছের চারপাশে কমপক্ষে এক মিটার জায়গা রাখা উচিৎ ছিল বলে তিনি জানান। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ হাদিউজ্জামান বলেন, রেইনট্রি গাছ মারা যাওয়ার অন্যতম কারণ বার্ধক্য।


হারিয়ে যাওয়া গাছ
ঢাকা শহরে বেশকিছু গাছ ইতিমধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অসচেতনতার ফলেই দুর্লভ গাছগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বলে জানালেন নিসর্গপ্রেমী অধ্যাপক দ্বীজেন শর্মা। বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া গাছগুলোর মধ্যে আছে লিয়্যুইয়া। নিসর্গপ্রেমী মোকারম হোসেন জানান, রেলওয়ে হাসপাতালের সামনের ত্রিভুজপার্ক ও গণভবনের সামনে দুটি লিয়্যুইয়া গাছ ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্যের বাসার সামনে পৃথিবীর সর্বশেষ প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয়া তালিপামটি মারা যায় ২০০৮ সালে। ৮০ বছর বয়সে একবার ফুল ফোটার মাধ্যমে গাছটির জীবনাবসান ঘটে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আরবরি কালচারের টেকনিক্যাল কর্মকর্তা ফেকুলাল ঘোষ কমল জানান, গাছটির ২শ চারা তৈরি করে বন বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রদান করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও রোপণ করা হয়েছে কয়েকটি চারা। বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া অপর একটি গাছের নাম করিফা ইলাটা। বলধা গার্ডেনে একটি করিফা ইলাটা ছিল।


ঢাকার দুর্লভ গাছ
রমনা পার্ক, বলধা গার্ডেন, বোটানিক্যাল গার্ডেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেন ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর বাগানে এখনো টিকে আছে বেশকিছু দুর্লভ গাছ। জানা যায়, কনকচাঁপা ফুলের মাত্র তিনটি গাছ এখন পর্যন্ত টিকে আছে এই শহরে। গাছ তিনটি আছে বলধা গার্ডেন, রমনা পার্ক ও শিশু একাডেমীর বাগানে একটি করে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, রমনা পার্ক এবং বঙ্গভবনের প্রাচীরঘেঁষে দিলকুশায় কয়েকটি বুদ্ধ নারকেল গাছ আছে। পাদাউক গাছের দেখা মেলে একমাত্র রমনা পার্কের লাগোয়া হেয়ার রোডে কয়েকটি। জানা যায়, এসব গাছ লাগিয়েছিলেন ব্রিটিশ বৃক্ষপ্রেমীক লুই প্রাউডলক। কুরচি গাছ অল্প কয়েকটি এখনো আছে বলধা গার্ডেন, রমনা পার্ক, কার্জন হল, শিশু একাডেমীর বাগানসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকায়। দুই-তিনটি পীত পাটনা গাছ আছে রমনা পার্কে। হাতেগোনা কয়েকটি আকাশনিম বা হিমঝুরি গাছের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান গ্রন্থাগারের প্রবেশপথে, বলধা গার্ডেনের পাশে খ্রিস্টান কবরস্থানে এবং শিশু একাডেমীর বাগানে কয়েকটির দেখা পাওয়া যায়। পাখিফুলের দেখা মেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবনের সামনে, জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও শিশু একাডেমীর বাগানে একটি করে। এছাড়া শহরের আর কোথাও এ গাছের দেখা পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে। বনপারুলের দেখা বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর বাগান ছাড়া আর কোথাও চোখে পড়ে না। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হলের সামনে সবচেয়ে বয়সী সিলভার ওক গাছের অবস্থান। মাধবীলতাকে কেউ কেউ ভুল করে মাধবী বললেও মাধবী নামে আলাদা এক ধরনের গাছ আছে। রমনা পার্ক, শিশু একাডেমী, বোটানিক্যাল গার্ডেন ও বলধা গার্ডেনে এ গাছের দেখা মিলবে বলে জানা গেছে। 


কানাইডিঙ্গা নামের এক বিরল গাছের অবস্থান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে, ঢাবি বোটানিক্যাল গার্ডেনে এবং মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদতাত্ত্বিক বাগানে। মাত্র তিনটি জহুরিচাঁপা গাছ আছে রমনা ও বলধা গার্ডেনে। ক্রিমফ্রুট নামটি ফলদ গাছের মতো শোনালেও আসলে এটি কোনো ফল গাছ নয়। এই প্রজাতির মাত্র ২টি গাছ আছে বলধা ও রমনায় একটি করে। ব্লাকবি নামেমাত্র একটি গাছ ঢাকায় আছে বলে জানা গেছে। গাছটি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার উত্তর পাশের সীমানায় অবস্থিত। 

ধানমন্ডি ৩/এ রোডে একটি এবং বলধা গার্ডেনে একটি করে ট্যাবেব্যুইয়া গাছের দেখা পাওয়া যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি বাওবাব গাছ ছিল। আবাসিক ভবন নির্মাণের সময় এটি কেটে ফেলা হয়। বলধা গার্ডেনে একটি ছিল বলে জানা গেছে। বর্তমানে রমনা ও ধানমন্ডি লেকে একটি করে দুটি বাওবাব গাছ আছে।

এছাড়া আরো যেসব গাছ দুর্লভ সেগুলো হচ্ছে বেরিয়া, রুদ্র পলাশ, স্কারলেট কর্ডিয়া, রাজ অশোক, মিলেশিয়া, মুচকুন্দ, জাকায়ান্ডা, গ্লিরিসিডিয়া প্রভৃতি।

পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর গাছ
পরিবেশবিদদের মতে, গাছ মানেই উপকারী। কিন্তু কখনো কখনো এলাকাভেদে কিছু গাছ পরিবেশের ক্ষতি করে থাকে। এরমধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইউক্যালিপটাস ও একাশিয়ার একাধিক প্রজাতি। এসব গাছের ব্যাপক চাষ মাটি থেকে অতিরিক্ত পানি শোষণ করে মরুময়তার সৃষ্টি করে বলে জানান অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা। তবে তিনি বলেন বিচ্ছিন্নভাবে কোথাও দুইএকটি গাছ লাগানো থাকলে তা তেমন কোনো ক্ষতির কারণ হয় না। এজন্য সেগুলো কাটার প্রয়োজন নেই। অনেক সময় অ্যালার্জির কথা বলে অনেক গাছ কেটে ফেলা হয় এটা ঠিক নয়। 

ছাতিম গাছের ফুলের গন্ধ অনেকের অ্যালার্জির কারণ হতে পারে। এজন্য গাছ কেটে ফেলতে হবে এমনটা ভাবা ঠিক নয়। কারণ ব্যক্তিভেদে যেকোনো জিনিস অ্যালার্জির কারণ হতে পারে। গণপূর্ত বিভাগের আরবরিকালচার বিভাগ থেকে জানা যায় চন্দ্রিমা উদ্যানের শতকরা ৮০ ভাগ গাছ একাশিয়া। এব্যাপারে অধ্যাপক শর্মা বলেন, আসলে ঢাকা শহরের কোনো উদ্যানই সুপরিকল্পিত নয়।

অপরিকল্পিত নগরায়ণে কাটা হচ্ছে গাছ
১৯৬৫ সালে অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা তার লেখা ‘শ্যামলী নিসর্গ’ বইয়ের প্রাক-কথনে পূর্বপাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকা সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘দ্বিতীয় রাজধানী ও শিল্পাঞ্চলসহ এ শহর একদিন মহানগরীতে উন্নীত হবে। এর নিসর্গ সেদিন কী রূপ নেবে আজই বলা কঠিন। আমরা অবশ্যই আশা করব আমাদের স’পতিরা বিভিন্ন দেশের শেষতম অভিজ্ঞতার সুযোগ গ্রহণে কার্পণ্য করবেন না।’ আজ এ শহর মহানগরীতে রূপ নিয়েছে। স’পতিরা কি সে সুযোগ গ্রহণ করেছেন? অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মার কাছ থেকেই জানা যাক। ‘উত্তরায় যখন প্রথম বাড়ি তৈরি করা শুরু হলো তখন সবাই একতলা বাড়ি নির্মাণ করলেন। বাড়ির চারপাশে, রাস্তার দুপাশে লাগানো হলো গাছ। এর কিছুদিন পরই বাড়িগুলো আবার ছয়তলা করার অনুমতি দেওয়া হলে কেটে ফেলা হলো বাড়ির চারপাশের গাছ। 

৮-১০ বছর পরে ড্রেন করতে গিয়ে কেটে ফেলা হলো রাস্তার দুপাশের গাছ। এ ড্রেন তৈরি করতে হবে এটা কি জানতেন না স্থপতিরা, তাহলে কেন গাছগুলো ওভাবে লাগানো হয়েছিল?’ অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, যশোর রোডে ব্রিটিশরা মাস্টারপ্লান অনুযায়ী গাছ লাগিয়েছিল বলেই আজ বড় বড় গাছ আমরা ওখানে দেখতে পাচ্ছি। ঢাকা শহরেও প্রাউডলক এ রকম প্লান করেছিলেন। কিন্তু পরে তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়নি।


ক্রিকেট বিশ্বকাপ উপলক্ষে ঢাকা শহরে চলছে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ। এ কাজে মিরপুর এলাকায় স্টেডিয়াম সংলগ্ন রাস্তা, প্রশিকা ভবন থেকে যে রাস্তা চিড়িয়াখানার দিকে চলে গেছে সেই হাজি রোডের দুপাশের কয়েকশ গাছ সমপ্রতি কেটে ফেলা হয়েছে রাস্তার উন্নয়ন কাজে। বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯-১০ অর্থবছরে সেনাসদরের সামনে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ২০৭টি গাছ প্রায় ৫ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। বনানী রেলক্রসিংসহ বিশ্বরোড থেকে টঙ্গী পর্যন্ত রেললাইনের দুপাশের প্রায় তিনশ গাছ কেটে ফেলা হয়েছে নিরাপত্তার কথা বলে।


বোটানিস্ট ছাড়াই চলছে বোটানিক্যাল গার্ডেন ও বলধা গার্ডেন
উদ্ভিদ সংরক্ষণ ও গবেষণার জন্য মিরপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেন ও বলধা গার্ডেন প্রতিষ্ঠিত হলেও উদ্যান দুটির একটিতেও নেই কোনো বোটানিস্ট বা উদ্ভিদ গবেষক। কোনো ছাত্র বা গবেষক উদ্যানে অবসি’ত গাছ সম্পর্কে জানতে উদ্যান অফিসে গিয়ে কোনো সহযোগিতা পান না বলে জানা গেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আরিফুর রহমান জানান, তিনি মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনের অফিসে গিয়েছিলেন গাছ সম্পর্কে জানতে। অফিসের কেউ তাকে সহযোগিতা না করে এ টেবিল থেকে ও টেবিলে পাঠিয়ে দিয়ে অবশেষে ১৯৯২ সালে প্রকাশিত একটি ব্রুশিয়ার ধরিয়ে দিয়ে বিদায় করে দেয়। 

অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শামসুল হক নামে এক বোটানিস্ট গত বছর জুন পর্যন্ত ওখানে কর্মরত ছিলেন। তিনিই মূলত গাছ সম্পর্কে মানুষকে জানানোর কাজ এবং গাছ নিয়ে গবেষণা করতেন। বর্তমানে তিনি এলপিআর-এ আছেন। বলধা গার্ডেন বোটানিক্যাল গার্ডেনের একটা উইং স্যাটেলাইট উদ্যান হওয়ায় সেখানেও গবেষণা কাজ চালাতেন শামসুল হক। বর্তমানে সেখানেও কোনো গবেষক বোটানিস্ট নেই বলে জানা গেছে।

ল্যান্ডস্কেপ

ল্যান্ডস্কেপ



ল্যান্ডস্কেপ হচ্ছে প্রাকৃতিক ভূ-দৃশ্য বা প্রাকৃতিক দৃশ্য অঙ্কনের চিত্রকলা। ল্যান্ডস্কেপিংয়ের মাধ্যমে একটি অঞ্চল, দেশ বা পুরো জগেকই বিরামহীন সৌন্দর্যে পরিণত করা যায়। উন্নত দেশগুলোতে ল্যান্ডস্কেপিংকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হলেও বাংলাদেশে এর ব্যবহার খুব সীমিত। নগর উন্নয়ন, পরিবেশ উন্নয়ন ও নগরকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করতে প্রয়োজন সুশৃঙ্খল নান্দনিক পরিকল্পনা।

শহরের ক্লান্তি এবং একঘেঁয়েমি দূর করতে ল্যান্ডস্কেপ সফলভাবে কাজ করে। তাই এর গুরুত্ব অপরিসীম। ফুল, বৃক্ষরাজি, নুড়ি-পাথর, ঝর্ণা, কৃত্রিম লেক এবং অব্যবহূত সামগ্রী (ফেলে দেওয়া) ইত্যাদি উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে একটি সুন্দর ল্যান্ডস্কেপে রূপ দেওয়া সম্ভব। আকৃতি ও পরিধি অনুযায়ী ল্যান্ডস্কেপ ভিন্নভাবে নির্মাণ করা হয়। 

কলেজ-ক্যাম্পাস, পার্ক, বিনোদনের জন্য ক্ষুদ্রাঞ্চল, শিল্প-কারখানা, অট্টালিকার সম্মুখভাগ, শহরের আইল্যান্ড, রাস্তার দু’পাড়, ত্রিকোনা স্থান, লেকের পাড়- একেক স্থানের ল্যান্ডস্কেপ একেক রকম হয়।

আবার কোনো ডিজাইন পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমেও এর মনোমুগ্ধকর রূপ দেওয়া সম্ভব। পেশাদারি দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, বনরক্ষণবিদ্যা, সৌন্দর্য বিষয়ক অভিজ্ঞতা, স্থাপত্য, বাগান পরিচর্যার দক্ষতা, ভূ-তত্ত্ব বিষয়ক অভিজ্ঞতা থাকলে অনায়াসেই একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ ও সৌন্দর্যমণ্ডিত ল্যান্ডস্কেপ সৃষ্টি করা সম্ভব। রাজধানীতে ল্যান্ডস্কেপ নির্মাণের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রক্ষণাবেক্ষণ।

সুশৃঙ্খল ও সুপরিকল্পিতভাবে হয়তো বিভিন্ন স্থানের ডিজাইন করা সম্ভব কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেগুলোর যথাযথ দেখভাল বা নিয়মিত পরিচর্যা না করলে সৌন্দর্য অটুট বা টেকসই থাকে না।জনগণের মধ্যে সৌন্দর্যবোধ জাগ্রত করে তাদেরকেও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। 

আমাদের প্রিয় নগরী ঢাকা বার বার বসবাসের অযোগ্য শহর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ থেকে রেহাই পেতে ল্যান্ডস্কেপ নির্মাণ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সেজন্য নগরের পরিচ্ছন্নতার বিষয়টির পাশাপাশি বেশি করে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান আয়োজন করতে হবে। গণমাধ্যম এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।

সবুজ গাছ শহরে যেটুকু আছে, সেগুলো রক্ষণাবেক্ষেণ করতে হবে। পরিকল্পনামাফিক গাছপালা, পুষ্পরাজি রোপণ করতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবেশবাদীদের ব্যাপক ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। 

শব্দ এবং বায়ু দূষণের নগরীতে ল্যান্ডস্কেপের লতাগুল্ম ও গাছপালা শান্ত পরিবেশ সৃষ্টি ও নির্মল বায়ুর যোগান দেয়। চোখকে করে প্রশান্ত। শুধু তাই নয়, ল্যান্ডস্কেপের ফলে উষ্ণ শহরে উত্তাপ কমে। ধুলোবালি কমে, সৃষ্টি হয় স্বাস্থ্যকর পরিচ্ছন্ন পরিবেশ।

বাঙালি বছরব্যাপী উত্সব-পার্বণে মেতে থাকে। কোনো উত্সব এলেই বহুজাতিক সংস্থা প্রচার ও প্রসারের জন্য গাছকে কাপড় পেঁচিয়ে সৌন্দর্যবর্ধন করতে চেষ্টা করে। এগুলো সৌন্দর্যের পরিপন্থি। 

ল্যান্ডস্কেপের ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম মানতে হবে যেমন ব্রিটিশ আমল থেকে সরকারি সংস্কৃতি গাছে রং করা এ থেকে বের হয়ে আসতে হবে। গাছে রং করা, গাছে পেরেক মেরে বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধ করতে হবে। টবে রং করা যাবে না। ফুটপাতে বিদ্যমান গাছের গোড়া কংক্রিট দিয়ে আটকানো যাবে না। সড়কের মিডিয়ানে বড় গাছ না লাগিয়ে তুলনামূলক ছোট আকৃতি ও কষ্টসহিষ্ণু গাছ লাগাতে হবে। বাড়ি বা পাঁচিলের দেয়ালে ক্লিপার গাছ ওঠাতে হবে। তাহলে সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে এবং খরচও সাশ্রয়ী হবে।

রাস্তা বা খোলা স্থানেই নয়, ল্যান্ডস্কেপের মাধ্যমে বাসা-বাড়ির সম্মুখ স্থান সৌন্দর্যও বাড়িয়ে তোলা যায় বহুগুণ। ময়লা-অবর্জনা পরিষ্কার তো থাকে। বাড়ির সামনে ক্ষুদ্র জলাশয় থাকলে হাঁস-মাছ চাষ করলে পানি নড়াচড়া হয়, ফলে সেই জমানো পানিতে ডেঙ্গু মশার বংশ বিস্তার ঘটে না। 

ল্যান্ডস্কেপের কারণে ভিন্নতর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এ ধরনের পরিবেশ খুব সহজেই পরিবেশের ভারসাম্যের জন্য সহায়ক। ল্যান্ডস্কেপের প্রয়োজনীয় উপকরণের ফলে, চারপাশে মৌমাছি, পাখি, ফড়িং, প্রজাপতি বিভিন্ন পতঙ্গ ও ক্ষুদ্র প্রাণীর আগমন ঘটে। ওখানে তাদের আবাস, খাদ্যের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

স্থাপত্যের ক্ষেত্রে ল্যান্ডস্কেপের গুরুত্ব অপরিসীম, এক্ষেত্রে ল্যান্ডস্কেপকে শিল্পকলা হিসেবে গণ্য করা হয়। দুটি বিষয়ের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে। স্থাপত্য এবং ল্যান্ডস্কেপ একে অন্যের পরিপূরক এবং সম্পূর্ণ স্থায়ী সৌন্দর্যের রূপ পেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। 


মানুষের ভেতরের সৌন্দর্যকে জাগ্রত করার পাশাপাশি নগরেও সবুজ-শ্যামল বাংলার অপার সৌন্দর্যের রূপ উপস্থাপন করা সম্ভব ল্যান্ডস্কেপ নির্মাণের মাধ্যমে। একমাত্র ল্যান্ডস্কেপ শিল্পকর্ম নির্মাণই পারে সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও সবুজ নগর উপহার দিতে কারণ পরিচ্ছন্নতা এবং সবুজায়নই ল্যান্ডস্কেপের মূল কাজ। ল্যান্ডস্কেপের কাজটি সফল হলেই সৃষ্টি হবে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ। এই নগরীও আমাদের কাছে আরো প্রিয় হয়ে উঠবে। বাড়বে পর্যটকের আনাগোনা। বাড়বে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ।

ইদানীং দেখা যাচ্ছে বিলবোর্ডের বিকল্প হিসেবে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ল্যান্ডস্কেপকে বেছে নিচ্ছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। অপরিকল্পিত বিলবোর্ড, ফেস্টুন, ব্যানার শহরের সৌন্দর্য নষ্ট করে। অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্পন্সরের মাধ্যমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ লোকেশনের ল্যান্ডস্কেপ করলে নাগরিকগণ উক্ত স্থানে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে। এতে করে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো আরো সহজ হয়।

নেতারাও বিলবোর্ডের প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন। আমি বলবো, নগরকে নিঃসর্গে পরিণত করুন। মানুষকে সতেজ নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ করে দিন। নিজের নামে ল্যান্ডস্কেপ নির্মাণ করুন নগরবাসী আপনাকে মনে রাখবে।

দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। মানুষের রুচিবোধও পরিবর্তন হচ্ছে। যাপিত জীবনধারা ও শহর, নগর পরিকল্পনামাফিক বিনির্মাণ হলে আমরা বাংলাদেশের আবহমান প্রকৃতি ও নান্দনিক শহরে বসবাস করতে পারব। বহির্বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের অবস্থান ভৌগোলিক গুরুত্বের পাশাপাশি ‘প্রকৃতির দেশ বাংলাদেশকে’ তুলে ধরতে সক্ষম হবো।
দ্বিজেন শর্মা

দ্বিজেন শর্মা



দ্বিজেন শর্মা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যার এম.এসসি (১৯৫৮)।বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ ও ঢাকার নটরডেম কলেজে অধ্যাপনা করেছেন অনেকদিন (১৯৫৮-১৯৭৪), অতঃপর মস্কোর প্রসিদ্ধ অনুবাদসংস্থা ‘প্রগতি প্রকাশনে’ অনুবাদক হিসাবে কর্মরত ছিলেন (১৯৭৪-১৯৯১)। 

তাঁর প্রকাশিত বইগুলির মধ্যে 
‘জীবনের শেষ নেই’ (১৯৭৮, ২০০০), 
‘শ্যামলী নিসর্গ’ (১৯৮০, ১৯৯৬), 
‘সপুষ্পক উদ্ভিদের শ্রেণীবিন্যাসতত্ত্ব’ (১৯৮১), 
‘সতীর্থবলয়ে ডারউইন’ (১৯৮৪), 
‘ফুলগুলি যেন কথা (১৯৮৮), 
‘বিগলযাত্রীর ভ্রমণকথা’ (১৯৯১), 
 ‘গহন কোন বনের ধারে’ (১৯৯৪)
‘ডারউইন ও প্রজাতির উৎপত্তি’ (১৯৯৭), 
‘গাছের কথা ফুলের কথা’ (১৯৯৯,২০০৩), 
‘সমাজতন্ত্রে বসবাস’ (১৯৯৯), 
নিসর্গ নির্মাণ ও নান্দনিক ভাবনা’ (২০০০), 
‘এমি নামের দুরন্ত মেয়েটি’ (২০০৫) ইত্যাদি। 

তিনি বহু গ্রন্থ অনুবাদও করেছেন। 

প্রাপ্ত পুরষ্কার : 
কুদরত-এ-খুদা স্মৃতি স্বর্ণপুরষ্কার (১৯৮৬), 
বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরষ্কার (১৯৮৭), 
এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরষ্কার (২০০০)। 

পরিবেশ ও প্রকৃতি বিষয়ক নানান সমস্যা সম্পর্কে অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মার মূল্যবান অভিমত ও পরামর্শগুলো আজ এখানে তুলে ধরা হোল। সাক্ষাৎকারটি গ্রহন করেছেন শেখর রায়।

আপনার ছেলেবেলাকার সময়ের আশেপাশের প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে কিছু বলুন।

দ্বিজেন শর্মা: আমার ছেলেবেলা কেটেছে মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখাতে পাথারিয়া পাহাড় এলাকার গ্রামে। তখনকার সময়ে আশেপাশে প্রচুর গাছপালা ছিল – যেমন বনজ গাছ তেমনি ফুলের গাছও ছিল অঢেল। গ্রামের সবার বাড়িতেই এমনকি জেলে কিংবা মাঝি সম্প্রদায়ের বাড়িতেও প্রচুর ফুলের গাছ ছিল। আমার বাবা ছিলেন কবিরাজ। বাড়িতে প্রচুর ভেষজ গাছপালা লাগিয়েছিলেন তিনি। আমরা ব্রাক্ষ্মণ বলে বাড়িতে নিত্যপূজার জন্য প্রতিদিনই ফুলের দরকার হোত। তাই সারাটা বাড়িই ছিল ফুলে ফুলে ভরা। আমরা এ পরিবেশেই বড় হয়েছি। দেশবিভাগের পর আমাদের গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায় বেশিভাগই চলে গেছে। পাথারিয়ার পরিবেশও এখন অনেকটাই বদলে গেছে। পাহাড়ের গাছপালা সব কাটা পড়েছে। আগে সেখানে কত রকমের যে গাছপালা ছিল – নাগেশ্বর, মাকড়িশাল, কুর্চি আরো নানান প্রজাতির ভেষজ ছিল – আমার বাবা সেখান থেকে কতো ভেষজ গাছপালা সংগ্রহ করতেন। কিন্তুএখন এখানে কিছু ইটভাঁটা আর স’মিল হয়েছে। এখানে গাছের যোগান দিতে গিয়েই এলাকার গাছপালা সব উজাড় হয়ে গেছে। আমি কিছুদিন আগেও বাড়িতে একটি কুর্চি আর একটি কনকচাঁপা গাছের চারা লাগানোর জন্য পাহাড়ে অনেক খুঁজেও কোন চারা পাইনি। কেবল আমাদের বাড়িতেই এখনো কিছু গাছপালা রয়েছে, আমরাও নতুন করে কিছু লাগিয়েছি।

নটরডেম কলেজের গাছপালা সমৃদ্ধ এই সুন্দর নৈসর্গিক ক্যাম্পাস নির্মানে আপনার অবদান অপরিসীম। কখন ও কিভাবে একাজ শুরু করলেন সে সম্পর্কে কিছু বলুন।

দ্বিজেন শর্মা:  নটরডেম কলেজে আমি যোগ দেই ১৯৬২ সালে। সম্ভবত ১৯৬৫ সালে কলেজ বাউন্ডারিতে ছোট্ট একটা জায়গাতে ছাত্রদের ব্যবহারিক ক্লাশের জন্য কিছু স্পেসিমেনের গাছ লাগাই। সে সময় সারা কলেজ ক্যাম্পাসেই বাগান করার প্রস্তাব দিই ফাদার টিমকে। উনি আমার প্রস্তাবটা সমর্থন করেন। ফাদার বেনাস সেদিনই কলেজ ছুটির পর আমাকে বায়োলজি ল্যাবে আসতে বলেন। আমি গিয়ে দেখি যে তিনি পুরো কলেজের মডেল সামনে নিয়ে বসে আছেন। কাঠির ওপরে তুলো জড়িয়ে কিছু গাছের মডেলও বানিয়েছেন। ফাদার বললেন – এই লন এই মাঠ সব আছে – কোথায় কোন গাছ লাগাবে দেখ। সেই গাছ লাগানোর শুরু হল। আমারও ল্যান্ডস্ক্যাপিং এ এই প্রথম হাতেখড়ি। কোন গাছের উচ্চতা, মাথার আকার-আকৃতি, পাতার রঙ এসব নিয়ে কোন ভিন্ন মত হলেই ফাদার তার ভেসপার পেছনে চড়িয়ে চলে যেতেন সেই গাছের কাছে। আমি তখন ঢাকার প্রায় সব গাছপালাই চিনি। শ্যামলী নিসর্গ লিখছি তখন। কাজেই কোথায় কোন গাছ পাওয়া যাবে তা ভালই জানতাম। এভাবেই আমরা কলেজের ল্যান্ডস্ক্যাপিং এর প্ল্যানটা করি। পরে ঢাকা ইউনিভার্সিটির মালি মোক্তারকে আমাদের কলেজে নিয়ে আসি। সে খুবই হেল্পফুল ছিল। এভাবেই ক্যাম্পাসটা গড়ে ওঠে। অসাধারণ সুন্দর একটা ক্যাম্পাস। আমি তো ৩/৪ বছর পরে প্রায় সন্ধ্যায়ই কলেজে গিয়ে মাঠে একা একা বসে থাকতাম বা ঘুরে বেড়াতাম। একেবারে অসম্ভব নীরবতা চারদিকে। পাখি আসত কতো। একেবারে আলাদা এক সৌন্দর্য ছিল যা আমি দারূণ উপভোগ করেছি। আমি আশা করি যে এই প্রজন্মের ছেলেরাও এর দ্বারা উদ্বুদ্ধ হবে, এনজয় করবে এবং শিখবে কিভাবে প্রকৃতির সঙ্গে বসবাস করতে হয়, প্রকৃতিকে সুন্দর করে সাজানো যায় এবং একটা ছোট্ট বাড়িকেও কিভাবে গাছপালা দিয়ে চমৎকার করে সাজানো যায়। এটা একটা বড় শিক্ষা।

আপনাদের সময়কার ঢাকা শহর আর এখনকার ঢাকা – এ দু’য়ের পরিবেশগত মিল অমিল কতোটুকু ?

দ্বিজেন শর্মা: এখনকার ঢাকা শহর তো সম্পূর্ণ বদলে গেছে। আমি ১৯৫৬ সালে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়তে আসি। তখন মতিঝিলে আমরা প্ল্যান্ট কালেকশনে যেতাম। মতিঝিল তখন ছিল একটা প্রশস্ত জায়গা, একটা বোধহয় দালান ছিল, নওয়াব বাড়ির ভাঙ্গা ধ্বংসাবশেষ ছিল একটা। আর কিছুই ছিল না। আমি থাকতাম তখন তেজগাঁয়ে। এর পর শহর বলতে কিছু ছিল না। সবচাইতে আকর্ষনীয় ছিল রমনা গ্রীন আর ইউনিভার্সিটির এলাকা। ১৯৬৫তে আমি সিদ্ধেশ্বরীতে চলে আসি। প্রায় রোজই আমি আর আমার বন্ধু আলী আনোয়ার দু’জনে মিলে এই অঞ্চলে দিনরাত কতো যে ঘুরে বেড়িয়েছি, কি যে সুন্দর ! সেই হেয়ার রোড এর রাত্র, মিন্টো রোডের রাত্র, বেইলি রোডের রাত্র, রাস্তার নিয়ন আলো এবং এই সবুজ, এই ঋতুতে ঋতুতে পরিবর্তন, কতো ফুল, কতো গাছ – এগুলি নিয়েই আমার বইয়ের নাম আমি “শ্যামলী নিসর্গ” রেখেছি। তাতে ওই জায়গার ছবি অনেকটাই ধরা পড়েছে। যেটা এখন ইতিহাস মাত্র। এখন এতোসব মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিং হয়েছে, গাছপালা কাটা পড়েছে, প্রাউডলক যে প্ল্যান করেছিলেন যার কিছু কিছু এখনো রমনা গ্রীনে আছে। আমরা সেটাকে ফলো করিনি। রাস্তার দু’পাশ বাদ দিয়ে আমরা এখন মিড আইল্যান্ডে গাছ লাগানোর চেষ্টা করি। তাতে গাছের কিছুই হয়না আমরা দেখতে পাচ্ছি। ঢাকা শহরের জনসংখ্যা তখন ছিল ১৫ লক্ষ, এখন তো ১ কোটির মতো হয়ে গেছে। তাদের বাড়িঘর, তাদের আবাসন, তাদের সমস্যা, যানজট এগুলো সেকালে একেবারে কিছুই ছিল না। আমরা তখন বেইলি রোডে হেঁটে বেড়িয়েছি, একটা গাড়িও হয়তো তখন দেখিনি ঘন্টার পর ঘন্টা। এখন সিদ্ধেশ্বরীতে আমার বাড়ির সামনের রাস্তাই আমি পার হতে পারি না। এই সবকিছুই একেবারে বদলে গেছে।

বর্তমানে ঢাকা শহরে যে বিউটিফিকেশন প্রোগ্রাম চলছে এর বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কিছু বলুন।

দ্বিজেন শর্মা: ঢাকায় প্রথম যখন বিউটিফিকেশন প্রোগ্রাম শুরু হয় আমার বেশ ভালোই লেগেছিল। বহুদিন ধরেই এ ধরনের কিছুই করা হয় না। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে শহরের সৌন্দর্যায়ন শহুরে স্থাপত্যেরই একটা প্রধান অংশ। সেখানে শহরের বাড়িঘর যখন বানানো হয় তখন শহরের আশেপাশের পরিবেশও তারা একইসঙ্গে প্ল্যান করে থাকে এবং সেভাবেই তার বাস্তবায়ন হয়। আমাদের শহরের বাড়িঘর তৈরি করা হয়েছে কিন্তু তার সঙ্গে মিলিয়ে ল্যান্ডস্ক্যাপিং কিছুই করা হয়নি। কিন্তু বর্তমানে শহরে সৌন্দর্যায়নে সময়ে দেখলাম যে বেশ বড় বড় বেশ কিছু গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। সৌন্দর্যায়নের যে কর্মসূচী সেটাও দ্বি-মাত্রিক ( Two Dimentional), দৈর্ঘ্য-প্রস্থে মিলিয়ে অনেকটা মৌসুমি ফুলের বাগানের মতো। এটা সৌন্দর্য বাড়ায় তবে এই মূহুর্তে আমাদের শহরে সবচেয়ে যেটা প্রয়োজন তা হল শহরে প্রচুর পরিমাণে বড় বড় গাছ লাগানো। আমাদের প্রয়োজন আবহাওয়ার দূষণ কমানো, অক্সিজেনের উৎপাদন বাড়ানো এবং যেহেতু আমাদের দেশ গ্রীষ্মপ্রধান সেজন্য রাস্তায় দরকার ছায়া। গাছপালা লাগানোরও একটা বিজ্ঞান আছে, সেই বিজ্ঞান আমরা অনুসরন না করলে এবং সেভাবে শহরের বড় বড় গাছের ছায়া বিস্তার করতে না পারলে এই সৌন্দর্যায়ন অনেকটা হবে কসমেটিক ট্রিটমেন্টের মতো। এটা রক্ষণাবেক্ষন করা বেশ কষ্টকর হবে। কারণ যত্ন না করলেই এটা লোপ পাবে। সারা শহর ধরে বছরের পর বছর জুড়ে এদের এতো সতর্ক যত্ন করা সম্ভব হবে বলে আমার মনে হয় না। এটা কিন্ত সৌন্দর্যানের একটা অংশ মাত্র, মূল অংশটাই বাদ পড়ে গেছে। এ মূল অংশটা হচ্ছে আমাদের শহরে নানা জাতের সুন্দর সুন্দর বড় বড়, টেকসই গাছ লাগানো এবং শহরটাকে রমনা গ্রীনের মতো সবুজ অঞ্চলে রূপান্তরিত করা দরকার। এর পরই এখনকার মতো এমন কসমেটিক সৌন্দর্যায়ন হতে পারে।

বর্তমানে ঢাকা শহরের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে যে পরিমাণ গাছপালা থাকা দরকার সে সম্পর্কে কিছু বলুন।

দ্বিজেন শর্মা: আমি পড়েছিলাম যে প্রত্যেক শহরে মাথাপিছু কমপক্ষে ৩টি করে বড় গাছ থাকা প্রয়োজন। আমাদের ঢাকার জনসংখ্যা যদি ১ কোটি হয় তবে ঢাকায় ৩ কোটি গাছ থাকা প্রয়োজন। এই হিসাবে আমাদের ঢাকায় কতোটা গাছ আছে ? প্রায় কিছুই নেই। এটা পরিবর্তন একান্ত প্রয়োজন। সেই সাথে আরেকটি দিকও আমি খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি – সেটা হল – যেহেতু আমাদের জনসংখ্যা এতো বেশি, জায়গা এতো কম – আমরা বড় বড় পার্ক তৈরি করতে পারি – লন্ডনে যেমন চেইনের মতো পার্ক আছে যার একটা থেকে আরেকটায় যাওয়া যায় – এতো বড় বড় পার্ক আমরা করতে পারবো না। আমাদের প্রয়োজন ছিল রাস্তাগুলোকে বড় করা এবং রাস্তার দু’পাশে দুই সারি করে বড় বড় গাছ লাগানো। আমাদের সমস্ত শরীরে ধমনীগুলো যেমন রক্ত সরবরাহ করে তেমনি রাস্তাগুলো হল শহরের ধমনী। রাস্তাগুলোর দু’পাশে গাছ লাগানো গেলে সবুজে সবুজে শহরটা ভরে যেত। আর আমরা শহরের সমস্ত জলাভূমি বাড়ি বানানোর জন্য ভরাট করে ফেলছি। এটা আরেকটা বড় ক্ষতি। এতে শহরের আবহাওয়া বদলে যাবে, জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে আরো নানান সমস্যার সৃষ্টি হবে। এখন আন্তর্জাতিকভাবে সারাবিশ্বে যখন জলাভূমি সংরক্ষণের দিকে গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে তখন আমরা মুখে বলি জলাভূমির সংরক্ষণের কথা অথচ বাস্তবে তার উল্টোটা করি। আমাদের নদীগুলো পর্যন্ত দখল হয়ে যাচ্ছে ! এধরনের অরাজকতাও এক ধরনের সন্ত্রাস – প্রকৃতির বিরুদ্ধে সন্ত্রাস। এই সন্ত্রাস অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। আমাদের জলাভূমি গুলোকে সংরক্ষণ করতে হবে, ওগুলো যত্ন করে খুঁড়ে ওখানে নানান ধরনের জলজ গাছপালা লাগিয়ে এগুলোকে জলজ পার্কে রূপান্তর করতে হবে। এগুলো শুধু আমাদেরই নয় আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একান্ত প্রয়োজন – তা নাহলে তারা আমাদের অভিশাপ দেবে।

বর্তমানে সরকারী-বেসরকারী পর্যায়ে যে বৃক্ষরোপন কর্মসূচী চলছে এ সম্পর্কে আপনার অভিমত কি ?

দ্বিজেন শর্মা: খুবই যান্ত্রিকভাবে বর্তমানে বৃক্ষরোপনের এ কাজটা করা হয়। আমি বহু চেষ্টা করেছি, এ নিয়ে বহু লেখালেখি করেছি। এক এক সময়ে বৃক্ষায়ণের এক এক রকম ঝোঁক উঠে – ফলজ বৃক্ষ, বনজ বৃক্ষ, ভেষজ বৃক্ষ – কিন্তু কার্যত লাগানো হয় দেখেছি মেহগনির গাছ আর বিদেশি একাশিয়া বা এ জাতীয় গাছ। সব জায়গায় ফলের গাছ লাগানোর প্রয়োজন নেই। যদি কেউ কাঠের গাছ লাগাতে চান তাহলে সেটা তিনি তার ব্যক্তিগত আয বৃদ্ধির জন্য করতে পারেন। কিন্তু জনসাধারণের জন্য যেসব গাছপালা লাগাতে হবে সেগুলো সঠিকভাবে নির্বাচন করা দরকার – কোথায় লাগানো হবে, কেন লাগানো হবে ইত্যাদি। রমনা পার্কে অনেকগুলি মেহগনি গাছ লাগানো হয়েছে যার কোন প্রয়োজন নেই। হেয়ার রোডে, মিন্টো রোডে যেখানে প্রাউডলক সাহেব যেসব গাছ লাগিয়েছিলেন তার ফাঁকে ফাঁকেও মেহগনি ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। সর্বত্র মেহগনি লাগানো হয়েছে – স্কুলে, কলেজে, সরকারি অফিসে, আদালতে যেখানে খালি জায়গা সেখানেই মেহগনি। এটা একটা অদ্ভুত মানসিকতা এবং বড়ই অদূরদর্শী এসব পরিকল্পনা। কখনো যদি মেহগনি গাছের কোন অসুখ হয়, মেহগনি গাছ যদি মারা যায় তাহলে বাংলাদেশ বৃক্ষশূন্য হবে। সুতরাং বৃক্ষরোপনও একটা বিজ্ঞান, এতে যেমন বিজ্ঞান আছে, তেমনি নন্দনতত্ত্ব আছে, তেমনি পরিবেশ চেতনা আছে। অনেক কিছু মিলিতভাবে আছে। সেজন্য বৃক্ষরোপনের জন্য একটা নির্দিষ্ট কমিটি থাকা দরকার, তাদের আলোচনা করা দরকার, প্রজাতি নির্ধারণ করা দরকার, সেগুলি যাতে লাগানো ও রক্ষা করা যায় তার তদারকি দরকার এবং সর্বাপরি দরকার যারা একাজে নিয়োজিত আছেন প্রকৃতির প্রতি তাদের ভালোবাসা। যান্ত্রিক ভাবে এসমস্ত কাজ সম্পন্ন হয়না।

জাতীয় পর্যায়ে বৃক্ষরোপন অভিযানে জীববৈচিত্র্য রক্ষার্থে কি ধরনের গাছপালা লাগানো দরকার বলে মনে করেন ?

দ্বিজেন শর্মা: জীববৈচিত্র্য রক্ষার্থে প্রথমত পরিবেশ বান্ধব গাছপালাই লাগানো দরকার। যেমন আমাদের শহরে পাখির খাবারের উপযোগি গাছপালা নেই এবং এ ধরনের গাছপালার কোন সঠিক তালিকাও পাওয়া যাবে না। যারা দীর্ঘদিন পাখি নিয়ে কাজ করেন, যারা পাখি চিনেন – তারাই বলতে পারেন পাখি কি ফল খায়, কোন্ ধরনের গাছের ফল খায় ইত্যাদি। এটা নিয়ে আরো কাজ করা উচিত, গাছের একটা পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা উচিত এবং বৃক্ষরোপণের সময় এ গাছগুলোকে যাতে প্রাধান্য দেয়া হয় সেদিকে নজর দেয়া উচিত। যেমন – একটা গাছ আছে জীবন বৃক্ষ – আমার এক বন্ধুর কাছেই এ সম্পর্কে প্রথম শুনি। তার বাড়িতে এ গাছ ছিল – সেখানে নাকি নানান জাতের পাখি আসত। আমি একদিন সেখানে গিয়ে লক্ষ্য করে দেখি ঠিকই। অথচ এ গাছটা যত্রতত্রই হয়। আমি একবার রমনা পার্কে পাকুড় গাছে লটকন বা ইন্ডিয়ান লরিকিট Loriculus vernalis) পাখি দেখেছিলাম। সেই পাকুড় গাছটা এখন নেই। বটগাছে প্রচুর পাখি আসে। কিন্তু বট অনেক জায়গা নিয়ে বড় হয় বলে বটগাছ লাগানোর সমস্যা আছে। দ্বিতীয় কথা হল – আমাদের দেশ যেহেতু নিুাঞ্চলে এবং জলাভূমিও আমাদের দেশে প্রচুর তাই জলাভূমির বনায়ন আমাদের দেশে খুবই জরুরী। আমরা যদি হাওড় এলাকায়, বিল এলাকায় প্রচুর হিজল, জারুল, বরুণ – এ জাতীয় গাছ লাগাতে পারি তাহলে আমাদের পুরো ল্যান্ডস্ক্যাপই বদলে যাবে। সেখানে নানা জাতের পাখি ও অন্যান্য ছোটখাট জীবজন্তুও আশ্রয় পাবে। এবং এমন গাছও আমরা খুঁজতে পারি যে গাছের ফল পানিতে পড়লে মাছে খাবে। আমাজনে এরকম গাছ আছে। আমাদের বরুণ গাছের গোটা মাছ খায় কিনা আমি জানিনা। পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। অন্যদিকে তেলাপিয়া মাছ সাদা শাপলা এবং শালুক খেয়ে ফেলে কিন্তু লাল শাপলা খায় না। তাই তেলাপিয়া মাছ যদি আমরা আমাদের প্রাকৃতিক জলাশয়ে ছাড়ি তবে আমাদের জাতীয় ফুল ভবিষ্যতে থাকবে না। আমি একবার বলধা গার্ডেনের পুকুরে দেখেছিলাম যে সেখানে একটাও সাদা শাপলা নেই – আমাজন পদ্ম (ঠরপঃড়ৎরধ ৎবমরধ) আছে আর লাল শাপলা আছে। আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম তোমাদের সাদা শাপলা কি হল ? ওরা বলল, ছিল কিন্তু এখন তো দেখছি না। বললাল, তেলাপিয়া আছে ? – আছে। তারপর পুকুর শুকিয়ে জল ফেলে দিয়ে তেলাপিয়া নিঃশেষ করে ওখানে আবার শাপলা লাগানো হল। কিন্তু অনেক সময় যারা বাগানের রক্ষণাবেক্ষণ করে তারা নিজেরা খাওয়ার জন্য আবার পুকুরে তেলাপিয়া ছেড়ে দেয়। রমনা পার্কে যে এতোবড় লেক আছে এটাকে কি একটা ওয়াটার গার্ডেন করা যায় না ? তা না করে সেখানে মাছের চাষ করে। মাছের চাষ কেন হবে পার্কে ? এটা তো ব্যবসার জায়গা নয়। যেজন্য পার্কে কোন মেহগনি গাছ লাগানোর প্রয়োজন নেই সেই একই কারণে পার্কের লেকে মাছ চাষেরও কোন প্রয়োজন নেই।

ব্যক্তিগত পর্যায়ে ফ্যামিলি গার্ডেনিং এর তাৎপর্য কি ?

দ্বিজেন শর্মা: ফ্যামিলি গার্ডেন খুবই দরকার। প্রথমত গাছপালা দেখলে নিজের মন ভাল থাকে। এটা একটা চমৎকার শখ, এজন্য গাছপালা সংগ্রহ, গাছপালার বই কেনা, বই পড়া, বই দেখা, গাছপালার মাধ্যমে বৃহৎ প্রকৃতির সঙ্গে এমনকি একটা নতুন জীবনদর্শণের সাথেও আমরা পরিচিত হতে পারি। দ্বিতীয়ত ছেলেমেয়েরা গাছপালা সম্পর্কে অনেক কিছু শিখতে পারে। এগুলো তাদের পাঠ্য বিষয়ে যেমন সহায়ক হবে তেমনি মানষিক বিকাশে, সৌন্দর্যবোধ বৃদ্ধিতে, প্রকৃতিপ্রেম বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আমাদের দেশে এখন নিজেদের বাগান করার মতো জায়গা নেই। খুবই কম জায়গা। সেজন্য আমাদের মানুষের গাছপালার প্রতি আগ্রহ রয়েছে। তারা নিজেদের নিজেদের ছোট্ট ব্যালকনিতে প্রচুর গাছপালা লাগায়। ঢাকায় এখন এতোগুলো ফুলের দোকান হয়েছে যে এতে বোঝা যায় ফুলের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। এর একটা বাণিজ্যিক দিকও রয়েছে যা যথেষ্ট লাভজনক। কিন্তু যারা গাছপালা কিনেন বা লাগান বা আনেন তাদের অনেকেই আমার ধারণা এগুলির সঠিক নামধাম, গোত্র ইত্যাদি জানেন না। এজন্য তাদের উচিত এগুলি সম্পর্কে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা, এগুলি সম্পর্কে ভালভাবে জানা এবং তাদের ছেলেমেয়েদেরকে এগুলি সম্পর্কে বলা। তাতে একদিকে যেমন তারাও লাভবান হবেন, তেমনি ছেলেমেয়েরাও লাভবান হবে, সমাজও লাভবান হবে। গাছপালা সম্পর্কে এ আগ্রহটা খুবই আশাব্যঞ্জক, খুবই পজেটিভ। কারণ আমাদের তো আর এই শহরে নিজের বাগান করার মতো জায়গা নেই, যেটুকু ব্যালকনি কিংবা ছাদ আছে তারই সদ্বব্যবহার করা উচিত।

আমাদের পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

দ্বিজেন শর্মা: আমরা যখন ছাত্র ছিলাম তখন আমরা ইকোলজি পড়েছি। আমি বলছি পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকের কথা। তখন কিন্তু ইকোলজিক্যাল ক্রাইসিস বলতে কিছুই ছিল না, এনভায়রনমেন্ট সাইন্স বলতে কিছুই ছিল না। এগুলি সব নতুন কারণ পৃথিবী এই পঞ্চাশ বছরে একটা বিরাট বিপর্যয়ের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। তার পরিবেশগত সমস্যা এতোই জটিল হয়েছে যে এটা তার অস্তিত্বকেই বিপর্যস্ত করে তুলেছে। প্রকৃতি সংরক্ষণের যে কোন উদ্দ্যোগই এখন একাধারে প্রয়োজনীয় এবং অপরিহার্যও বটে। ফলে Nature Study ‍Society পত্রিকা যদি কিছুমাত্রও প্রকৃতি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা এবং প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রতি ভালবাসা লালনে কোন ভূমিকা রাখে সেটা আমাদের সকলের জন্যই অত্যন্ত মঙ্গলজনক হবে। আমি আশাকরি তারা যেহেতু এ দায়িত্ব নিয়েছেন তাতে এটাই প্রমাণিত হয় যে তারা প্রকৃতির এই সমস্যা সম্পর্কে, মানুষের সমস্যা সম্পর্কে খুবই সচেতন এবং তারা এটা চালিয়ে যাবেন।

পত্রিকার পক্ষ থেকে আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

দ্বিজেন শর্মা: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার গ্রহন: শেখর রায়, ১১/০৩/২০০৫